বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ এ ০৩:০৮:৩০ পিএম (বাংলাদেশ সময়)
ব্রেকিং নিউজ:
• মা হারালেন চিত্রনায়িকা পপি, চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোক •       • ২৪ ঘণ্টা পরও জ্বলছে ইনানীতে ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের আগুন, ১৫ কিমি এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ •       • স্বাস্থ্যসেবা খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রতি ডা. জুবাইদা রহমানের আহ্বান •       • পটিয়ায় আবারও অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, স্বামী পুলিশ হেফাজতে •       • চার দিনের সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান •       • নরসিংদীতে বাসার গ্রিল কেটে ৫০ লাখ টাকা ও ৮ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি •       • কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি টুটুল গ্রেপ্তার •       • মাদরাসায় বলাৎকার ও অশালীন ঘটনা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে সরকার: ধর্মমন্ত্রী •       • বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে স্কুলছাত্রীর অনশন •       • মাদারগঞ্জে গাছে মরিচ আসতেই অজানা মড়ক: লোকসানের মুখে কৃষকরা, দেখা মেলেনি কৃষি কর্মকর্তার •

আইন দিয়ে নয়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধেই ব্যাংক খাতের সংস্কার সম্ভব: ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

আইন দিয়ে নয়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধেই ব্যাংক খাতের সংস্কার সম্ভব: ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

ঢাকা প্রেস ডেস্ক নিউজ
 

কেবল কঠোর আইন প্রণয়ন করে ব্যাংক খাতের সংস্কার সম্ভব নয়। এ জন্য ব্যাংকার ও শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে ন্যূনতম নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীলতার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
 

তিনি বলেন, আর্থিক খাত পুরো অর্থনীতির ‘হৃদপিণ্ড’। তাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ খাতকে সুবিধা বিতরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
 

রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং কনফারেন্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের গতিশীলতা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতিগত সমন্বয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
 

ব্যাংক খাতের অতীতের ভুল তুলে ধরে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে না তুলেই বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এর মাশুল এখনো দিতে হচ্ছে। ২০০৩ সালের দিকে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার এবং কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্যাংক খাত আবারও সংকটের মুখে পড়ে।
 

তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাতের অনিয়ম ‘ঋণখেলাপি সংস্কৃতি’ থেকে আরও ভয়াবহ ‘ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতিতে’ রূপ নিয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যবসা ও ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে তা করতে গিয়ে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। রাজনৈতিক সরকারের প্রভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে অন্যায্য সুযোগ-সুবিধা বিতরণের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
 

রিজার্ভ বেড়েছে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদ বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দিয়ে ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
 

তিনি জানান, ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১৫টি ব্যাংকে সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা বা ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ’ (একিউআর) করা হয়েছে। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
 

কবির আহমেদ বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনাদায়ি ঋণের (এনপিএল) হার ছিল ৩৬ শতাংশ। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘স্পেশাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ ও ‘মানি অ্যাক্ট’ প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
 

ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ, নগদ প্রবাহভিত্তিক ঋণদান এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ ছাড়া আঞ্চলিক অর্থনীতি শক্তিশালী করতে ব্যাংকিং কার্যক্রমের বিকেন্দ্রীকরণ এবং আগামী বছর ব্যক্তি-পর্যায়ে লেনদেনের (পিটুপি) জন্য সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেম চালুর ঘোষণা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ডেপুটি গভর্নর।
 

ঋণপ্রবাহে স্থবিরতা নিয়ে উদ্বেগ

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি ও সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন বলেন, অতীতে ব্যাংক খাতে যে অবাধ লুটপাট চলেছে, তা বন্ধ হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে।
 

তবে বেসরকারি খাতে প্রকৃত ঋণপ্রবাহ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসা এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ও কারখানা সম্প্রসারণে স্থবিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
 

মাসরুর আরেফিন বলেন, পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) ৪৮-এ নেমে আসা অর্থনৈতিক সংকোচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও ৯ দশমিক ৫ শতাংশ নীতি সুদহার সংকোচনমূলক নীতির প্রভাব তৈরি করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতেও একধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে।
 

ব্যাংক একীভূতকরণের পরও আমানতকারীদের আস্থা বজায় থাকাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকারি মেগা প্রকল্পগুলো পুনরায় চালু করার আহ্বান জানান এই ব্যাংকার।
 

প্রকৃত উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন নিশ্চিতের তাগিদ

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, দেশের অর্থনীতির সিংহভাগ অর্থায়ন আসে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। তাই ব্যাংক খাত সংস্কারে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা সহজে অর্থায়নের সুযোগ পান এবং ব্যাংকগুলোর পরিচালন সক্ষমতাও সুরক্ষিত থাকে।
 

তিন নীতির সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব

সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার। তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বাণিজ্যনীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি।
 

তিনি উল্লেখ করেন, সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণ নেওয়ায় মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নীতিগুলোর মধ্যে অধীনতামূলক সম্পর্কের পরিবর্তে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
 

মুন্ডেল-ফ্লেমিং কাঠামোর উল্লেখ করে ড. জায়েদী সাত্তার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তার জন্য রাজস্বনীতি এবং নমনীয় বিনিময় হারনীতি অনুসরণের প্রস্তাব দেন। ২০২২ সালের মে মাস থেকে টাকার প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়নের প্রভাব মোকাবিলায় শুল্ক হ্রাস অথবা ‘কমপেনসেটেড ডেপ্রিসিয়েশন’ নীতি গ্রহণের সুপারিশ করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রপ্তানি ও আমদানি প্রবৃদ্ধিতেও গতি আনতে পারে।
 

সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের অধ্যাপক ও সম্মেলন আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান ড. প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি। বিশেষ অতিথি হিসেবে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান প্রধান জিন পেসমে ব্যাংক খাতের সম্পদ পর্যালোচনা এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।
 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এযাজুল ইসলাম।