মঈনুদ্দিন শাহীন, কক্সবাজার:
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য খননকাজের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও নেভানো সম্ভব হয়নি। আগুনের শিখা বিদ্যুতের তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা এড়াতে ঘটনাস্থলের চারপাশের ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে সাধারণ মানুষের চলাচলে সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।
গ্যাসের উৎস, প্রকৃতি ও সম্ভাব্য মজুত সম্পর্কে জানতে বুধবার সকালে ঘটনাস্থলে অনুসন্ধান শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)-এর বিশেষজ্ঞ দল। এর আগে মঙ্গলবার রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সংস্থাটির প্রতিনিধিরা। তবে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এর প্রকৃতি, উপাদান ও মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলপ্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভের গ্যাসস্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল। প্রায় এক হাজার ফুট গভীরতায় পৌঁছানোর পর ভূগর্ভের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে গ্যাস ওপরে উঠে নলকূপের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।
তিনি জানান, গ্যাসস্তরের ওপরের অংশ উন্মুক্ত হয়ে গেলে উচ্চচাপের গ্যাস ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে পথ তৈরি করে কয়েক দিন পরও ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। গ্যাসের সংস্পর্শে কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মানুষের কর্মকাণ্ড কিংবা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ থেকেও এ ধরনের আগুন লাগতে পারে।
আগুনের রং ও ধোঁয়া পর্যবেক্ষণ করে গ্যাসটিতে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বাপেক্সের এই কর্মকর্তা। তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত গ্যাসের প্রকৃত ধরন ও উপাদান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একই কারণে সেখানে কী পরিমাণ গ্যাস রয়েছে, সে বিষয়েও এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
নাফিফুন আরহাম আরও বলেন, গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করতে বা এর চাপ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এতে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখাই প্রধান অগ্রাধিকার। গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি নির্ধারণে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেন। কিন্তু ভূগর্ভ থেকে অব্যাহতভাবে গ্যাস বের হতে থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল ও কারিগরি সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। একই সঙ্গে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও অবহিত করা হয়েছে।
গ্যাসের মজুত নিয়ে আলোচনা
ইনানীতে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাস বের হওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এ ঘটনা থেকে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। এ জন্য গ্যাসের নমুনা পরীক্ষা এবং বিস্তারিত ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।
বাপেক্সের অনুসন্ধান বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জেবুন নাহার বলেন, সংস্থাটির একটি প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। দলটি গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় ফিরবে। এরপর বাপেক্সের পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ করা হবে। এক থেকে দুই দিনের মধ্যে পরীক্ষার কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্লেষণের ফল পাওয়া গেলে সেখানে কী ধরনের গ্যাস রয়েছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, নলকূপ খননের সময় অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। সাধারণত মাটির অল্প গভীরে বায়োজেনিক গ্যাস থাকতে পারে, যা ভূগর্ভে গ্যাসের পকেটে জমা হয়।
জেবুন নাহার আরও জানান, বাপেক্স সাধারণত যে গভীরতা থেকে গ্যাস উত্তোলন করে, তা অন্তত ২ হাজার ৫০০ মিটার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মিটারেরও বেশি। তবে ইনানীতে প্রায় ৮০০ ফুট গভীরতার স্তর থেকে গ্যাস উঠছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ওই এলাকায় স্তরভিত্তিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ করা হলেও গভীর অনুসন্ধান হয়নি।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর আগে খাগড়াছড়ির সেমুতাংয়ে একটি গ্যাসক্ষেত্র এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর থেকে সাগরের দিকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ দুটি ছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলে আর কোনো গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বাঁশখালীতে দুটি কূপ খনন করা হলেও সেখানে গ্যাস পাওয়া যায়নি।
যেভাবে শুরু হয় আগুন
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সম্প্রতি ইনানী গ্রামের ছোট সেতু এলাকায় মোস্তফা সিকদারের বাড়ির কিছু জমি কিনে সেখানে খামারবাড়ি নির্মাণ করছিলেন। ওই বাড়িতে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ করতে গিয়েই গ্যাস বের হওয়ার ঘটনা ঘটে।
মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ১০ থেকে ১৫ দিন আগে সেখানে একটি গভীর নলকূপ খনন করা হয়েছিল। তবে ৭০০ ফুট গভীরে যাওয়ার পরও পান করার উপযোগী পানি পাওয়া যায়নি। পরে গত সোমবার থেকে পাশের আরেকটি জায়গায় নলকূপ বসানোর কাজ শুরু করেন শ্রমিকেরা। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে হঠাৎ নলকূপ স্থাপনের স্থান থেকে আগুন বের হতে শুরু করে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। এ কারণে স্থানটিকে নিরাপত্তাবলয়ের আওতায় আনা হয়েছে এবং বাপেক্সকে খবর দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে কাজ করছে।







