প্রকাশকালঃ ৬ অক্টোবর ২০২৬, রাত ৮:১৫ সময়

সাত দশক পর ভারতের আসাম থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে বাংলাদেশে সরাসরি বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন শুরু হয়েছে। আসামের ডিব্রুগড় থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেছে ‘ডিএলবি পাটকাই’ নামের একটি পণ্যবাহী বার্জ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভারতের স্বাধীনতার পর আসাম থেকে সরাসরি বাংলাদেশের কোনো বন্দরের উদ্দেশে বাণিজ্যিক নৌযাত্রার এটি প্রথম ঘটনা।
সোমবার ডিব্রুগড়ের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ‘কুশল কোঁওর’ নামের টাগবোটের সহায়তায় বার্জটি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এ নৌযাত্রার উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এ সময় ভারত ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছাড়াও কেন্দ্র ও রাজ্যের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিধায়করা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, বহু দশক পর ডিব্রুগড়ে আবারও স্টিমারের সিটি শোনা যাচ্ছে। এই নৌযাত্রার মাধ্যমে ডিব্রুগড়সহ উত্তর-পূর্ব ভারত আন্তর্জাতিক জলপথ বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলো।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা এ ঘটনাকে আসামের অর্থনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এর ফলে আসামে উৎপাদিত বিভিন্ন শিল্পপণ্য নদীপথে দেশের বাইরের বাজারে পৌঁছানোর নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
চালানটির মিথানল উৎপাদন করেছে আসামের নামরূপের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আসাম পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেড (এপিএল)। বগিবিল থেকে পানগাঁও পর্যন্ত নৌপথের দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার।
এর মধ্যে ভারতের অংশে বার্জটি ব্রহ্মপুত্রের জাতীয় জলপথ-২ (এনডব্লিউ-২) ব্যবহার করে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করবে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছানোর পর ভারত-বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপথ প্রটোকল (আইবিপিআর) রুট ধরে পানগাঁও বন্দরে যাবে পণ্যবাহী বার্জটি।
তবে ডিব্রুগড় থেকে পণ্য পরিবহনে ব্রহ্মপুত্রের ব্যবহার নতুন নয়। একসময় এই নদীপথে ডিব্রুগড় থেকে চা পরিবহন করা হতো। পরবর্তী সময়ে রেল যোগাযোগের বিস্তারের সঙ্গে নদীপথে পণ্য পরিবহন কমে যায়। ১৯৫৬ সালে ডিব্রুগড়ের ঐতিহাসিক ঘাটটিও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত করতে সাম্প্রতিক সময়ে বগিবিল ও ধুবড়িতে কাস্টমস ও অভিবাসন-সংক্রান্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বগিবিলে যাত্রী ও পণ্য টার্মিনাল চালু করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অবকাঠামো উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর নৌবাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এর আগে ২০২২ সালে বাংলাদেশের জলপথ ব্যবহার করে ভারতের হলদিয়া থেকে গুয়াহাটির পান্ডুতে টাটা স্টিলের পণ্য পরিবহন করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে পর্যটকবাহী জাহাজ ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ও এই রুট ব্যবহার করে।
তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, আসাম থেকে সরাসরি কোনো বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের ঘটনা এবারই প্রথম।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধসহ বিভিন্ন শিল্পে মিথানল ব্যবহৃত হয়। ফলে আসাম থেকে সরাসরি নদীপথে মিথানল পরিবহনের এই উদ্যোগ দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়ক ও রেলপথের পাশাপাশি নদীপথে পণ্য পরিবহন বাড়ানো গেলে পরিবহন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে টেকসই বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় রূপ দিতে নিয়মিত নৌসেবা চালু রাখা, কাস্টমস ও পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ফেরার পথে পণ্য পরিবহনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি হবে।