প্রকাশকালঃ ৫ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২:১১ সময়

ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণাঞ্চলে যানবাহনের দ্রুত বৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত অনস্ট্রিট পার্কিং সড়কের কার্যকর প্রশস্ততা কমিয়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি করছে। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯, ডিটিসিএ আইন, ২০১২ এবং জাতীয় সমন্বিত বহুমাধ্যমভিত্তিক পরিবহন নীতিমালা ২০১৩-এ পার্কিং ব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ থাকলেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ঢাদসিক) এলাকায় এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট, আধুনিক ও বাস্তবায়নযোগ্য অনস্ট্রিট পার্কিং প্রবিধানমালা প্রণীত হয়নি। এই প্রবন্ধে বর্তমান সমস্যার বিশ্লেষণ, নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার যৌক্তিকতা এবং প্রস্তাবিত কাঠামোর মূল উপাদান আলোচনা করা হয়েছে। একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন যানজট হ্রাস, রাজস্ব স্বচ্ছতা, সড়ক শৃঙ্খলা এবং নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আধুনিক নগর পরিকল্পনায় পার্কিং ব্যবস্থাপনা শুধু যানবাহন রাখার স্থান নির্ধারণ নয়; এটি সড়ক নেটওয়ার্কের দক্ষতা, পরিবহন ন্যায্যতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক এলাকায় বাণিজ্যিক কেন্দ্র, আবাসিক এলাকা এবং মিশ্র ব্যবহারের রাস্তাগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। ফুটপাত দখল, ডাবল পার্কিং, বিপরীতমুখী পার্কিং এবং নো-পার্কিং জোনে গাড়ি রাখার ফলে পথচারী ও জরুরি সেবার চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় একটি আধুনিক, ডিজিটাল ও জবাবদিহিমূলক অনস্ট্রিট পার্কিং নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
ঢাকায় যানবাহনের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু সড়কের ধারণক্ষমতা সে অনুপাতে বাড়েনি। অনস্ট্রিট পার্কিং নিয়ন্ত্রণের অভাবে রাস্তার একটি বড় অংশ স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি পার্কিংয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে:
- সড়কের কার্যকর প্রশস্ততা কমে যাচ্ছে এবং যানজট বাড়ছে;
- ফুটপাত ও জেব্রা ক্রসিং অবরুদ্ধ হয়ে পথচারীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে;
- হাসপাতাল, স্কুল ও জরুরি সেবার প্রবেশপথে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে;
- পার্কিং ফি আদায়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব ও নগদ লেনদেনের সুযোগ রয়েছে;
- আবাসিক এলাকায় গ্যারেজবিহীন বাসিন্দাদের জন্য কোনো সুশৃঙ্খল নাইট পার্কিং ব্যবস্থা নেই।
এই সমস্যাগুলো শুধু যানজটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস, বায়ু দূষণ বৃদ্ধি এবং নাগরিক অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ধারা ১২১ সিটি কর্পোরেশনকে প্রবিধানমালা প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। ডিটিসিএ আইন, ২০১২ এবং জাতীয় সমন্বিত বহুমাধ্যমভিত্তিক পরিবহন নীতিমালা ২০১৩-এ নগর পরিবহন উন্নয়নে পার্কিং নীতিমালার গুরুত্ব স্বীকৃত। তবুও ঢাদসিক এলাকায় এখনো কোনো বিস্তারিত ও বাস্তবায়নযোগ্য অনস্ট্রিট পার্কিং প্রবিধানমালা নেই। ফলে পার্কিং ব্যবস্থাপনা খণ্ডিত, অস্বচ্ছ এবং অপ্রতুলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি সমন্বিত প্রবিধানমালা প্রণয়ন এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে।
একটি আধুনিক অনস্ট্রিট পার্কিং নীতিমালা নিম্নলিখিত কারণে অপরিহার্য:
১. যানজট নিরসন ও সড়ক দক্ষতা বৃদ্ধি
জোনভিত্তিক পার্কিং নির্ধারণ এবং রাস্তার প্রশস্ততার সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশের বেশি পার্কিং বরাদ্দ না করা হলে সড়কের কার্যকর ক্ষমতা বাড়বে। ব্যস্ত রাস্তায় (৩০ ফুটের কম) পার্কিং নিষিদ্ধকরণ এবং মোড়, সিগন্যাল, বাস স্টপ ও জরুরি প্রবেশপথের আশেপাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ যান চলাচলকে মসৃণ করবে।২. স্বচ্ছ রাজস্ব আদায় ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা
নগদ লেনদেন নিষিদ্ধ করে স্মার্ট অ্যাপ ও ডিজিটাল পেমেন্ট বাধ্যতামূলক করা হলে দুর্নীতির সুযোগ কমবে এবং কর্পোরেশনের রাজস্ব বাড়বে। প্রগ্রেসিভ চার্জ (সময় বাড়ার সঙ্গে ফি বৃদ্ধি) দীর্ঘমেয়াদি পার্কিং নিরুৎসাহিত করবে এবং স্বল্পমেয়াদি ব্যবহারকে উৎসাহিত করবে।৩. সামাজিক ন্যায্যতা ও আবাসিক সুবিধা
আবাসিক এলাকায় গ্যারেজবিহীন বাসিন্দাদের জন্য নিয়ন্ত্রিত নাইট পার্কিং পারমিটের ব্যবস্থা থাকলে সাধারণ নাগরিকদের সুবিধা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক এলাকায় উচ্চ হার আরোপ করে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।৪. আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহিতা
ডিএমপি ট্রাফিক এবং কর্পোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সমন্বিত ক্ষমতা, স্পট ফাইন ও রেকারিংয়ের সুস্পষ্ট বিধান থাকলে আইন প্রয়োগ কার্যকর হবে। অনাদায়ী ফি বিআরটিএ ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত করে আদায়ের ব্যবস্থা করলে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ কমবে।৫. পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা
যানজট কমে গেলে জ্বালানি অপচয় ও বায়ু দূষণ কমবে। ফুটপাত মুক্ত রাখা হলে পথচারীদের চলাচল নিরাপদ হবে এবং নগরের বাসযোগ্যতা বাড়বে।
একটি কার্যকর প্রবিধানমালায় অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত:
- চাহিদাভিত্তিক তিনটি জোন (উচ্চ বাণিজ্যিক, মিশ্র ও আবাসিক);
- স্মার্ট অ্যাপভিত্তিক স্লট বুকিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট;
- প্রগ্রেসিভ ফি কাঠামো;
- স্বচ্ছ ইজারা পদ্ধতি;
- স্পষ্ট অপরাধ ও শাস্তির বিধান;
- কেন্দ্রীয় পরিচালনা ও তদারকি কমিটি (ডিএমপি, প্রশাসন, বিশেষজ্ঞ ও জনপ্রতিনিধি সমন্বিত)।
বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, জনসচেতনতা, ইজারাদারদের নিয়মিত মনিটরিং এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ থাকবে। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দ্রুত খসড়া প্রণয়ন, স্টেকহোল্ডার পরামর্শ এবং পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হচ্ছে। নিয়মিত মূল্যায়ন ও তথ্যভিত্তিক সংশোধনের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অনস্ট্রিট পার্কিং নীতিমালার অনুপস্থিতি নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে রাখছে। একটি আধুনিক, ডিজিটাল ও ন্যায্যভিত্তিক প্রবিধানমালা প্রণয়ন শুধু যানজট কমাবে না, বরং রাজস্ব স্বচ্ছতা, সড়ক শৃঙ্খলা এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করবে। সরকারের দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এই লক্ষ্য অর্জনে অপরিহার্য। সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিলে ঢাকার দক্ষিণাঞ্চল একটি সুশৃঙ্খল ও বাসযোগ্য নগর এলাকায় পরিণত হতে পারে।