প্রকাশকালঃ ১৬ মার্চ ২০২৬, দুপুর ১২:০২ সময়

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহাল করে আপিল বিভাগের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হবে। তবে তা কার্যকর হবে আগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। রায়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার কথা বলা হলেও এর জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। অথবা, পঞ্চদশ সংশোধনীর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যে মামলা চলছে, তার রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নাও হতে পারে।
এদিকে পুরোনো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফেরত এলে সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু জুলাই সনদে বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতিকে বাইরে রেখে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে একমত হয়েছিল দলগুলো। ফলে জুলাই সনদ অনুসরণ করতে হলে এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
গত বছরের ২০ নভেম্বর সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার প্রায় চার মাস পর ৭৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি ১২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের বেঞ্চ আপিল বিভাগের ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা দুটি পৃথক সিভিল আপিল মঞ্জুর ও চারটি রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি করে সর্বসম্মতভাবে এ রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ে এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ও সাংবিধানিক বলা হয়েছে।
রিভিউকারীদের একজনের আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এ ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন। তিনি গতকাল সমকালকে বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সংসদ বিলুপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানে ১২৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিধান করা হয়েছে, সংসদ বিলুপ্তির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব নয়। তাই আগে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে হবে।
পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিধান করা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা লাভজনক পদ গ্রহণ করতে পারবেন না। এই অনুচ্ছেদ বহাল থাকায় ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা হতে পারবেন না।
ত্রয়োদশ সংশোধনীতে সংবিধানের তৃতীয় তপশিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টাদের শপথ ফরম যুক্ত করা হয়েছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীতে তা বাতিল করা হয়। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরাতে হলে শপথের বিধানও ফেরাতে হবে।
প্রসঙ্গত, পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি মামলা আপিল বিভাগের বিচারাধীন আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই মামলায় হাইকোর্ট ছয়টি অনুচ্ছেদের সংশোধন বাতিল করেন। বাকিগুলো সংসদের হাতে ছেড়ে দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়।
আইনজীবীরা বলেছেন, যদি আপিল বিভাগ পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করেন, তাহলে ত্রয়োদশ সংশোধনী কার্যকরে বাধা থাকবে না। তা না হলে সংসদে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকরের পথ তৈরি করতে হবে।
জুলাই সনদে কী আছে
জুলাই সনদেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে বলা আছে। তাতে বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতিকে বাইরে রেখে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে একমত হয়েছে দলগুলো।
এতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবিত নাম থেকে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার এবং তৃতীয় বৃহত্তম দলের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি প্রধান উপদেষ্টা বাছাই করবে।
তা সম্ভব না হলে সরকারি দল পাঁচটি নাম দেবে, বিরোধী দল পাঁচটি নাম দেবে। তৃতীয় বৃহত্তম দল দুটি নাম দেবে। সরকারি দল, বিরোধী দল এবং তৃতীয় বৃহত্তম দলের নাম থেকে একজন করে বাছাই করবে।
অনুরূপ বিরোধী দলও সরকারি দল ও তৃতীয় বৃহত্তম দলের নাম থেকে একজন করে বাছাই করবে। তার পর কমিটি ৪-১ ভোটে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবে।
এর পরও প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা না গেলে কমিটিতে দুজন বিচারপতি যুক্ত হবেন। তারাও যদি অন্তত ৫-২ ভোটে বাছাই করতে না পারেন, তাহলে র্যাঙ্ক চয়েজ ভোট পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করা হবে।
তবে এই ধাপে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছে বিএনপি। তারা বলছে, সংসদে বাছাই পদ্ধতি চূড়ান্ত হবে। গণভোটে জুলাই সনদে উল্লিখিত পদ্ধতি অনুমোদিত হয়েছে। বিরোধী দল এই পদ্ধতি চাচ্ছে। এর মধ্যে ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহালের চূড়ান্ত রায় এলো। তাই কোন পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে, তার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শুরু এবং ...
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচন বর্জনকারী আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে ষষ্ঠ সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৮(ক) ও ৫৮(২ক) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার বিধান ছিল ওই সংশোধনীতে। পরের তিনটি সংসদ নির্বাচন এই ব্যবস্থায় করা হয়।
কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১১ সালের মে মাসে প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি আখ্যা দিয়ে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। যদিও রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, সংসদ চাইলে পরবর্তী দুই নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকতে পারে। তবে বিচার বিভাগকে এ থেকে দূরে রাখতে হবে। ২০১১ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করে।
পূর্ণঙ্গ রায়ে যা বলা হয়েছে
আদালত বলেছেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা-সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিচ্যুতি ছিল না; বরং এই সংশোধনীর মাধ্যমে প্রণীত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছিল গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ।
তৎকালীন আপিল বিভাগের রায় সম্পর্কে বর্তমান পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী রায়টি ছিল অনুমাননির্ভর ও ত্রুটিপূর্ণ। তৎকালীন আপিল বিভাগ বলেছিলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনির্বাচিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে আঘাত করে। শুধু তাই না, এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। একজন প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার জন্য প্রভাবিত হতে পারেন– এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো আইন বাতিল করা মানে হচ্ছে তা অনুমাননির্ভর রায়। এ ধরনের অনুমাননির্ভর রায় বিচার বিভাগের আইন প্রণয়নমূলক জ্ঞান এবং সংশোধনমূলক ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করে। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘অগণতান্ত্রিক’ এবং ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনের পরিপন্থি’ হিসেবে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, জনগণের সার্বভৌমত্ব কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনের মাধ্যমেই নিশ্চিত হয় না, বরং জনগণের প্রকৃত সম্মতির প্রতিফলন ঘটে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ধারণা নয়, ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অনাস্থা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতে জাতীয় ঐকমত্যের ফসল।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। প্রকৃতপক্ষে এ ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে একটি অনন্য রাজনৈতিক সমঝোতা থেকে।
রায়ের পর্যবেক্ষণ
আপিল বিভাগ রায়ের অভিমত দিয়েছেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য তৈরি হয়েছিল, তাই এটি নিজেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের পর তিনটি নির্বাচন ২০১৪, ২০১৯ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনকে সর্বোচ্চ আদালত গণতন্ত্রের করুণ পরিণতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
২০১০ সালের রায়কে আইন বিভাগের এক ধরনের হস্তক্ষেপ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে পর্যবেক্ষণে। আদালত বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আইনসভা বিচার বিভাগকে ইঙ্গিত দিচ্ছিল, নির্দেশই দিচ্ছিল– তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে। যদিও তা আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ এবং বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম আলাদা পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘জনগণই সংসদ ও আদালতের প্রকৃত মালিক। সংবিধান ধ্বংসের জন্য নয়, বরং যারা সংবিধানকে কলুষিত করে তাদের উৎখাতে জনগণ সর্বোচ্চ ক্ষমতা রাখে।’
এই বিচারপতি আরও বলেছেন, সংবিধানকে কেবল একটি অক্ষরের দলিল হিসেবে দেখলে হবে না, এর ভেতরের মূল স্পৃহা দিয়ে বুঝতে হবে।
আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনরুজ্জীবিত হলো। তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে না। এর জন্য সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারবেন। তবে বর্তমান সংসদ তা জুলাই সনদ অনুযায়ী– পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংশোধন করতে পারবেন।
রায়ের পর বিএনপির আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণতন্ত্র সুরক্ষার রক্ষাকবচ, যা পুনরায় সক্রিয় করা হলো। সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক রাজনীতির ফায়দা লুটতেই তত্ত্বাবধায়ক বাতিল করে দেশে গণতন্ত্র ধ্বংস করেছিলেন।
