প্রকাশকালঃ ১১ জুলাই ২০২৬, বিকাল ৫:৫৪ সময়

মো: আমিনুুল ইসলাম
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে বন্যার প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি নদীর নাব্যতা হ্রাস, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, খাল-নদী দখল, বন উজাড় এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে পাহাড়ে মৌসুমি বন্যা নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানি বিভিন্ন খাল, ছড়া, ঝিরি ও নদী হয়ে কাপ্তাই হ্রদে জমা হয়। পরে তা কর্ণফুলী নদী দিয়ে সাগরের দিকে প্রবাহিত হওয়ার কথা থাকলেও নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমা এবং বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতার কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না। একই সঙ্গে কাপ্তাই বাঁধের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
এ বছরের টানা বর্ষণে তিন পার্বত্য জেলাসহ চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাহাড়ধসে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সাজেকে কয়েকশ পর্যটক আটকা পড়েন এবং বান্দরবানের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে প্রশাসন নির্দেশনা দেয়।
খাগড়াছড়ি শহরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সংকীর্ণ ড্রেন নির্মাণ এবং খাল দখলের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাল ভরাট বা সংকুচিত হওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত চেঙ্গী নদীতে প্রবাহিত হতে পারছে না। ফলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই শহর ও আশপাশের এলাকা জলাবদ্ধতা ও বন্যার কবলে পড়ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, চেঙ্গী, মাইনী, কাচালংসহ বিভিন্ন নদীতে দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে গভীরতা কমে গেছে। এছাড়া অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও নদীতীরের দখলদারিত্ব নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করছে। এতে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নিচের দিকে নামতে না পেরে আশপাশের জনপদ প্লাবিত হচ্ছে।
এদিকে নির্বিচারে বন উজাড় এবং পাহাড় কাটার কারণেও পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় পাহাড়ের মাটির পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে ভারী বৃষ্টির সময় অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে এসে বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয়রা মনে করছেন, তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রম প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা, খাল পুনরুদ্ধার, পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, নদী খনন, বন সংরক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, কাপ্তাই বাঁধের পানি ব্যবস্থাপনা, নদীর নাব্যতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং পার্বত্য অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর সমন্বিত গবেষণা পরিচালনা করে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করা না গেলে আগামী বছরগুলোতে বন্যা ও পাহাড়ধসের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।