প্রকাশকালঃ ৩০ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ৩:৫২ সময়

মো. শফিকুল ইসলাম, রাজশাহী ব্যুরো:

রাজশাহীর চারঘাটে দখলমুক্ত না হতেই বড়াল নদীতে নতুন করে দখলের হিড়িক পড়েছে। গত এক সপ্তাহে নদীর অন্তত পাঁচটি স্থানে আরসিসি ঢালাই দিয়ে ভবন ও দোকানঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। দিনের আলোয় প্রকাশ্যে নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ চললেও তা বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এতে পুরোনো দখল উচ্ছেদ না হতেই নতুন করে নদীর জায়গা দখলের পরিধি বাড়ছে।
একসময় পদ্মা ও যমুনার সংযোগ রক্ষাকারী প্রবাহমান বড়াল নদী এখন দখল ও দূষণের কারণে অস্তিত্ব সংকটে। স্থানীয়দের কাছে নদীটি ‘মরা বড়াল’ নামেই বেশি পরিচিত। নদীর বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে উৎসমুখ পদ্মা-বড়ালের মোহনা এলাকায় নদীর দুই তীর দখল করে গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবন, পৌরসভার মার্কেট, গণশৌচাগারসহ নানা স্থাপনা। কোথাও কোথাও নদীর ভেতরেও নির্মাণ করা হয়েছে স্থাপনা।
নদীর জায়গায় নতুন নির্মাণ
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বড়াল নদীর শিমুলিয়া, পুঠিমারি ও বাটিকামারী এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর জায়গায় নতুন করে নির্মাণকাজ চলছে। কয়েকটি স্থানে আরসিসি ঢালাই দিয়ে ভবনের ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। কোথাও আবার ভবনের পরিধি বাড়ানোর জন্য ঢালাইয়ের রড বের করে রাখা হয়েছে।
শিমুলিয়া এলাকায় নদীর ভেতরে আরসিসি ঢালাই দিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন স্থানীয় মিনারুল ইসলাম। ভবনের পরিধি বাড়ানোর জন্য ঢালাইয়ের রডও বের করে রাখা হয়েছে।
নদী দখল করে নির্মাণকাজের বিষয়ে জানতে চাইলে মিনারুল ইসলাম বলেন, ‘কত মানুষই তো ঘরবাড়ি করেছে। কতজনকে বাধা দিয়েছেন? পুরোটা নদীর জায়গা নয়।’
তবে স্থানীয় বাসিন্দা মখলেসুর রহমানের দাবি, পুরো জায়গাটিই নদীর। সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয়রা বাধা দিলেও তা মানা হয়নি।
পুঠিমারি-বাটিকামারী এলাকায় আগে চায়ের দোকান করতেন রবিউল ইসলাম। বর্তমানে সেখানে তাঁর ছেলে আল আমিন আরসিসি ঢালাই দিয়ে দুই কক্ষের ঘর নির্মাণ করছেন। একটি কক্ষ ভাড়া দেওয়ার পাশাপাশি অন্যটিতে নিজেদের দোকান করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল ওহাব বলেন, ‘জায়গাটি নদীর। চা বিক্রি করতে করতে এখন ঘর তৈরি করছে। এভাবে দখল হতে থাকলে নদীর পাড় বলে কিছুই থাকবে না।’
অবশ্য আল আমিনের দাবি, জায়গাটি তাঁদের নিজস্ব এবং নদীর জায়গায় নয়, নিজেদের জমিতেই তিনি ঘর নির্মাণ করছেন।
এদিকে পুঠিমারি এলাকায় কিছুদিন আগে নদীর জায়গা দখল করে দোকানঘর নির্মাণ করেছেন স্থানীয় ইমদাদুল ইসলাম ও আব্দুর রহমান। তাঁদের ভাষ্য, অনেকেই নদীর পাশে দোকান করেছেন, তাঁরাও করেছেন। সব জায়গা নদীর নয়। সরকারি জায়গা হলে সরকার চাইলে ব্যবস্থা নেবে।
দুই দশকে তালিকায় শতাধিক দখলদার
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বড়াল নদীর দখলদার উচ্ছেদে গত দুই দশকে একাধিকবার তালিকা তৈরি ও হালনাগাদ করা হয়েছে।
২০০৫ সালে নদীর দুই পাড়ের ৬৮ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা করা হয়। ২০০৮ সালে হালনাগাদ করে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৩ জনে। ২০১৯ সালে সরেজমিন তদন্তে ৫৬ জন এবং ২০২৫ সালে ১০১ জন দখলদারের তালিকা করা হয়।
সর্বশেষ চলতি বছরের মে মাসে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশে হালনাগাদ করা তালিকায় ১১০ জনকে দখলদার হিসেবে উল্লেখ করে তালিকা পাঠানো হয়েছে।
সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, চারঘাট স্লুইসগেট এলাকায় ২৯ জন, সরদহে ৩ জন, বাটিকামারীতে ২৫ জন এবং আড়ানী বড়াল সেতু সংলগ্ন রামচন্দ্রপুর এলাকায় ৫৪ জন দখলদার রয়েছেন।
তবে সম্প্রতি নদীর জায়গায় নতুন করে স্থাপনা নির্মাণকারীদের অনেকের নাম ওই তালিকায় নেই। এমনকি নদীর জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ থাকা চারঘাট পৌরসভা এবং নদীর ভেতরে বৃক্ষরোপণ করা বন বিভাগের নামও দখলদারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
উচ্ছেদ কমিটি হলেও কার্যক্রম এগোয়নি
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবার দখলদারদের তালিকা হালনাগাদের পর উচ্ছেদের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)কে প্রধান করে উচ্ছেদ কমিটিও গঠন করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক চাপসহ নানা কারণে শেষ পর্যন্ত উচ্ছেদ কার্যক্রম আর এগোয়নি।
ফলে পুরোনো দখলদারদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। বরং এর সুযোগে নদীর জায়গা দখল করে নতুন নতুন স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা বেড়েছে।
বড়াল রক্ষা আন্দোলনের নেতাকর্মী ও পরিবেশকর্মীদের দাবি, সরকারি তালিকায় দখলদারের সংখ্যা শতাধিক হলেও বাস্তবে এ সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। নদীর তীর ও নদীর ভেতরে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন স্থাপনা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) চারঘাট উপজেলা সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘নদী দখলকারীদের তালিকা করে উচ্ছেদ করা তো দূরের কথা, নতুন যারা দখল করছে তাদের বাধা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে এসব তালিকা করে লাভ কী? সরকারি হিসাবে দখলদার শতাধিক হলেও বাস্তবে সংখ্যা চার শতাধিক।’
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ সরকার বলেন, দখলদারের সংখ্যা ১১০ জনের চেয়ে বেশি। পর্যায়ক্রমে সব দখলদারই তালিকায় আসবে। উচ্ছেদ কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে কাজ চলছে এবং খুব দ্রুত কার্যক্রম শুরু হবে। নতুন করে যারা দখল করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চারঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মীর মেজবাহীজ্জুলাম চৌধুরী বলেন, ‘নতুন দখলকারীদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত নতুন দখল বন্ধ ও পুরোনো দখল উচ্ছেদ করা না হলে বড়ালের অস্তিত্ব আরও সংকটে পড়বে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।