প্রকাশকালঃ ১২ এপ্রিল ২০২৬, দুপুর ৪:৫৮ সময়

ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার।
ডাউনিং স্ট্রিটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র, উভয় পক্ষকেই বর্তমান অচলাবস্থা কাটিয়ে একটি সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। যখন পারস্য উপসাগর থেকে লেবানন সীমান্ত পর্যন্ত যুদ্ধের দামামা বাজছে, তখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই মধ্যস্থতামূলক অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ওমানের সুলতানের সাথে এক জরুরি ফোনালাপে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ওমান ঐতিহাসিকভাবেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি গোপন ও নির্ভরযোগ্য সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে আসছে। স্টারমার জোর দিয়ে বলেন যে, এই মুহূর্তে একটি যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা অত্যন্ত অপরিহার্য।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কোনো পক্ষই ধৈর্য না দেখায় এবং উত্তেজনা প্রশমনে ব্যর্থ হয়, তবে এর ফলাফল পুরো বিশ্বের জন্য ভয়াবহ হবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মতে, সকল পক্ষেরই উচিত যেকোনো ধরনের উস্কানি এড়িয়ে চলা এবং সংঘাতের বিস্তার রোধ করা।
ইসলামাবাদে আলোচনা ব্যর্থ হওয়া নিয়ে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বিবিসির রবিবারের লরা কুয়েনসবার্গ প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে এই ব্যর্থতাকে চরম হতাশাজনক বলে অভিহিত করেছেন।
স্ট্রিটিং বলেন, বিশ্ববাসী আশা করেছিল যে এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি কূটনৈতিক সমাধান আসবে। তবে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার মানে এই নয় যে কূটনীতির পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। একই সাথে তিনি ব্রিটিশ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পরিষ্কার করেন।
স্ট্রিটিং সাফ জানিয়ে দেন যে, এই দ্বন্দ্বে সরাসরি সামরিকভাবে যুক্ত না হওয়ার যে সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্য নিয়েছে, তা সঠিক এবং সংগত। ব্রিটেন চায় আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ফিরুক, অস্ত্রের ঝনঝনানির মাধ্যমে নয়।
ব্রিটেনের এই উদ্বেগের মূল কারণ লুকিয়ে আছে ইসলামাবাদের সেই ব্যর্থ টেবিল বৈঠকে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানিদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি একে ওয়াশিংটনের একতরফা চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই আলোচনাকে চূড়ান্ত এবং সর্বোত্তম অফার বলে অভিহিত করে তেহরানের ওপর দায় চাপিয়েছেন। এই দুই বিপরীতধর্মী অবস্থানই মূলত স্টারমারের মতো বিশ্বনেতাদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি নয়, তখন মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা কেবল একটি অলীক স্বপ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কিয়ার স্টারমার কেন ওমানের সুলতানের সাথে কথা বললেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ওমানের রাজধানী মাস্কাট বছরের পর বছর ধরে ইরান ও মার্কিন বন্দি বিনিময় থেকে শুরু করে পরমাণু আলোচনার গোপন পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
স্টারমার হয়তো চাইছেন ওমানকে ব্যবহার করে তেহরানকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে, অথবা অন্ততপক্ষে একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে রাজি করাতে। লন্ডনে যখন কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, তখন লেবাননের দক্ষিণে ইসরায়েলি বিমান হামলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে। বিন্ট জাবিল এবং সিদ্দিকিনের মতো শহরগুলোতে ইসরায়েলের অব্যাহত বোমাবর্ষণ প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ে শান্তির কোনো ছিটেফোঁটাও নেই।
আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, তার সাফল্য এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র সংকটের ওপর। কারণ হিজবুল্লাহর ওপর ইরানের প্রভাব এবং ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, এই দুটি বিষয় একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কিয়ার স্টারমারের এই আহ্বান পরোক্ষভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিও একটি বার্তা। ট্রাম্পের সর্বোচ্চ চাপ নীতি অতীতে সংঘাত বাড়িয়েছে বলে অনেক ইউরোপীয় মিত্র মনে করেন। স্টারমার চাইছেন ট্রাম্প প্রশাসন যেন কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে আলোচনার পথটি খোলা রাখে। যুক্তরাজ্যের জন্য এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় ধরনের যুদ্ধ মানেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন করে শরণার্থী সংকটের আশঙ্কা।
স্টারমার যে উপায়ের কথা বলেছেন, সেটি কয়েকটি সম্ভাবনা হতে পারে, যেমন ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা। ইরান যদি তাদের পরমাণু কর্মসূচিতে কিছুটা ছাড় দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারে।
এছাড়া কেবল ইরান, যুক্তরাষ্ট্র নয়, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে নিয়ে একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা অথবা পুনরায় ওমানের মধ্যস্থতায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করা।
ইসলামাবাদে যে কূটনৈতিক পরাজয় ঘটেছে, তা সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের জন্য একটি বড় ধাক্কা। কিয়ার স্টারমারের আহ্বান সেই ভেঙে পড়া মনোবলকে পুনরায় চাঙ্গা করার একটি চেষ্টা মাত্র। তবে বাস্তবতা হলো, যতক্ষণ না তেহরান ও ওয়াশিংটন তাদের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে পারছে, ততক্ষণ কোনো মধ্যস্থতাই ফলপ্রসূ হবে না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর একটি পথ খুঁজে বের করার আহ্বান এখন ইতিহাসের এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি।
একদিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দক্ষিণ লেবানন, অন্যদিকে তেহরানের পিঠ ঠেকে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকট, এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বিশ্বকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা শান্তির পথে হাঁটবে না কি এক প্রলয়ংকরী যুদ্ধের দিকে।
আপাতত লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিট থেকে শুরু করে মাস্কাটের সুলতানের প্রাসাদ, সবখানেই উৎকণ্ঠা। যুদ্ধের মেঘ সরাতে কিয়ার স্টারমারের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটা সফল হয়, তা দেখার জন্য বিশ্ববাসীকে আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে।