প্রকাশকালঃ ৭ মে ২০২৬, দুপুর ৪:৪৬ সময়

দুই দশকেরও বেশি সময় আগে দায়ের হওয়া এক দুর্নীতি মামলায় অবশেষে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের বিচার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কোটি টাকার বেশি অবৈধ অর্থ গোপনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আজ অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও বছরের পর বছর মামলার কার্যক্রম স্থগিত থাকার পর এই বিচার বিভাগীয় পদক্ষেপ রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক বেগম শামীমা আফরোজ এ আদেশ দেন। মামলার আসামিদের পক্ষ থেকে করা অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে দিয়ে আদালত তোফায়েল আহমেদসহ মোট তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এর মাধ্যমে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রমের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার অবসান ঘটল। আদালত মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২২ জুন দিন ধার্য করেছেন।
দুপুরে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। তোফায়েল আহমেদের আইনজীবী মো. খায়ের উদ্দিন শিকদার আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, তারা আসামিদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতির আবেদন জানিয়েছিলেন, কিন্তু আদালত তা আমলে না নিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। ২২ জুন থেকে প্রসিকিউশন পক্ষ তাদের সাক্ষীদের উপস্থাপন করবে।
এই মামলার অন্য দুই আসামি হলেন, ম্যাডোনা অ্যাডভারটাইজিং লিমিটেডের প্রধান হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম এবং ভোলার বাসিন্দা মোশারফ হোসেন। শুনানির সময় মোশারফ হোসেন আদালতে সশরীরে উপস্থিত থাকলেও অন্য আসামিদের পক্ষে আইনজীবীরা প্রতিনিধিত্ব করেন।
মামলাটির শেকড় দুই দশক গভীরে প্রোথিত। ২০০২ সালে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর (বর্তমানে দুদক) পরিদর্শক কাজী শামসুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। মামলার এজাহারে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অভিযোগ করা হয়েছে যে, সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তার রাষ্ট্রীয় পদের অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ অর্জন করেছেন।
এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, তোফায়েল আহমেদ তার অবৈধভাবে অর্জিত ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা গোপন করার উদ্দেশ্যে এক সুদূরপ্রসারী কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখে বা অর্থের উৎস আড়াল করতে তার সহযোগী ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
দুদকের দাবি, ম্যাডোনা অ্যাডভারটাইজিং লিমিটেডের প্রধান হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম এবং মোশারফ হোসেনের সঙ্গে যোগসাজশ করে সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল করপোরেট শাখা থেকে বিভিন্ন সময়ে ওই এক কোটি ২৫ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছিল। পরে সুবিধাজনক সময়ে ওই অর্থ ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল মানি লন্ডারিং বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বৈধ করার একটি অপচেষ্টা।
তদন্ত শেষে দুদক এই তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করলেও মামলাটির বিচার কাজ শুরু করতে দুই যুগের কাছাকাছি সময় লেগে গেল। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে মামলার কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে স্থগিত ছিল। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মামলার ফাইল হিমাগারে চলে যাওয়া বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে বিরল নয়।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচার বিভাগে গতিশীলতা আসে। উচ্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে এই মামলার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন এবং পুনরায় কার্যক্রম শুরু করার জন্য নিম্ন আদালতকে নির্দেশ দেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজ অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।
তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম এক চাণক্য হিসেবে পরিচিত। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক হিসেবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার রয়েছে। তবে বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও আওয়ামী লীগ শাসনামলে তিনি ছিলেন প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার শুরু হওয়াকে ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
অন্যদিকে, তোফায়েল আহমেদের সমর্থকরা মনে করেন, এই মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য পুরনো একটি মামলাকে পুনরায় চাঙ্গা করা হয়েছে। তবে দুদকের প্রসিকিউটররা বলছেন, অর্থ লেনদেনের দালিলিক প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে এবং তারা আদালতে তা প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন।
২২ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া সাক্ষ্যগ্রহণ পর্বে ব্যাংক কর্মকর্তা, তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করা হবে। ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার উৎসের সন্ধানে ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং ম্যাডোনা অ্যাডভারটাইজিংয়ের হিসাবপত্রের ফরেনসিক রিপোর্টও আদালতে পেশ করা হতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, যদি এই মামলায় তোফায়েল আহমেদ দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তাকে কয়েক বছরের কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। যেহেতু এটি একটি স্পেশাল জজ আদালতের মামলা, তাই এর রায় দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং বড় মাপের রাজনৈতিক নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করা বর্তমান বিচারিক কাঠামোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। তোফায়েল আহমেদের এই মামলার মাধ্যমে দেশের বিচার বিভাগ কতোটা নিরপেক্ষভাবে প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দিতে পারে, তার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহিতার বিষয়টি।
আজকের এই অভিযোগ গঠন কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে সময়ের ব্যবধানে যেকোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির ফাইল পুনরায় উন্মোচিত হতে পারে। ২২ জুনের সাক্ষ্যগ্রহণের দিকে এখন দৃষ্টি থাকবে সংবাদকর্মী ও সাধারণ জনগণের।