প্রকাশকালঃ ১৩ মে ২০২৬, বিকাল ৫:২৮ সময়

মিটামইন (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বিপর্যস্ত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল—অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন—এ অবশেষে রোদের দেখা মিলেছে। রোদ ফিরতেই কাটা ধান রক্ষা করতে হাওরপাড়ে শুরু হয়েছে কৃষকদের, বিশেষ করে নারীদের এক নীরব লড়াই।
মঙ্গলবার সকাল থেকে অষ্টগ্রামের বিভিন্ন খলা, অলওয়েদার সড়কের দুই পাশ এবং উঁচু জায়গাগুলোতে শত শত নারীকে ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কেউ ধান উল্টে দিচ্ছেন, কেউ ঝাড়ে ময়লা পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ শুকনো ধান বস্তাবন্দি করছেন। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের এই অবিরাম শ্রম হাওরজীবনের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
অষ্টগ্রামের দেওঘর, কলমা, কাস্তুল ও আবদুল্লাহপুর এলাকার খলাগুলো ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই স্থানীয়রা ধান রক্ষার কাজে সময় কাটাচ্ছেন। অনেক নারী শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়েই খলায় এসেছেন। ঘরের কাজ সামলে তাদের একটাই লক্ষ্য—যেভাবেই হোক ধান শুকিয়ে ঘরে তোলা।
দেওঘর গ্রামের গৃহবধূ আয়েশা খাতুন বলেন,
“কয়দিনের বৃষ্টিতে সব শেষ হওয়ার উপক্রম হইছিল। আজ রোদ পাইয়া খলায় আইছি। এই ধান বাঁচাইতে না পারলে সংসার চালানো কষ্ট হইয়া যাইবো।”
কলমা গ্রামের জেলে পাড়ার কৃষাণী রিতা রানী দাস বলেন,
“সকাল থেইক্কা ধান উলডাইতেছি। রোইদ কতক্ষণ থাকবো কেডা জানে, ধান না হুগাইলে খাইমু কী? তাই যতখান পারি হুগাইতেছি।”
রোদ ফিরে এলেও কৃষকদের দুশ্চিন্তা এখনো কাটেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। হাওরের অনেক নিচু জমিতে এখনো পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও পানির মধ্যেই ধান কাটতে হচ্ছে কৃষকদের।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, মিঠামইনের ভরাজি বিল ও শিংরাকান্দা বিলে পানির মধ্যে ধান কাটতে গিয়ে অনেকে জোঁকের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এতে শ্রমিকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পানি থাকায় হারভেস্টার মেশিন দিয়েও ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে বাধ্য হয়ে বিকল্প উপায়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকেরা।
কৃষক ইব্রাহিম মিয়া বলেন, “আর দুই-তিন দিন রোদ থাকলে অনেক ধান রক্ষা করা সম্ভব। আবার বৃষ্টি আইলে বড় ক্ষতি হইবো।”
এদিকে শ্রমিক সংকট ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের কারণে ধান কাটার মজুরিও বেড়ে গেছে। নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং আজও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলায় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অষ্টগ্রাম ও ইটনা উপজেলা।
রোদে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও পুরো হাওরাঞ্চলে এখনো অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। তবুও খলায় নারীদের এই অবিরাম পরিশ্রমই এখন কৃষকদের জন্য নতুন করে বেঁচে থাকার আশা হয়ে উঠেছে।