প্রকাশকালঃ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৫০ সময়

ঢাকা প্রেস প্রতিবেদক
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের নতুন বিলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অস্পষ্টতা রয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে শৃঙ্খলা বাহিনী ও তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনের চাওয়া প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ে বাহিনী দাখিল না করলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়েও আইনে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
গত রোববার জাতীয় সংসদে বিল দুটি পাস হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এগুলো আইনে পরিণত হবে। বিল দুটি পাসের সময় বিরোধী দল প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। তাদের অভিযোগ, নতুন আইনের মাধ্যমে সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন বা গুমের ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
সরকারের প্রাথমিক খসড়ার তুলনায় সংসদে পাস হওয়া বিলে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিরোধী দল, ভুক্তভোগী ও বিভিন্ন অংশীজনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গোপন বন্দিশালা, কারাগার, হাজতসহ বিভিন্ন স্থানে পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, কমিশনকে আলামত জব্দের ক্ষমতা না দেওয়ায় এ ক্ষমতা যথেষ্ট কার্যকর হবে না।
অন্তর্বর্তী সরকার আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশে কমিশনকে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল এবং গুমের অভিযোগ তদন্তের সুযোগও রাখা হয়েছিল। পরে অধ্যাদেশ দুটি সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় কার্যকারিতা হারায়। নতুন সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইন বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করে।
নতুন আইনের ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, শৃঙ্খলা বাহিনী বা বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশন সরাসরি তদন্ত করবে না। বরং সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। বাহিনী প্রতিবেদন দেওয়ার পর কমিশন সেটিতে সন্তুষ্ট না হলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে।
এর আগে এ প্রতিবেদনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় আইনটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সমালোচকদের আশঙ্কা ছিল, বাহিনী দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিবেদন না দিলে তদন্ত বিলম্বিত হতে পারে এবং এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
এ পরিস্থিতিতে আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনার পর বিলটিতে সংশোধন আনা হয়। পাস হওয়া আইনের ১৯(২) ধারায় বলা হয়েছে, কমিশন যে সময়সীমা নির্ধারণ করবে, সেই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
তবে সংশোধনের পরও নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কমিশনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাহিনী প্রতিবেদন না দিলে কমিশন কী পদক্ষেপ নিতে পারবে, তা আইনে স্পষ্ট করা হয়নি। অন্যদিকে ১৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে, প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে কমিশন ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে পারবে। ফলে প্রতিবেদনই যদি দাখিল না করা হয়, তাহলে ওই ধারার আওতায় কীভাবে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিসের মতে, কমিশন নিজে তদন্ত না করে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করলে সেই প্রতিবেদনে অসন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। তাঁর প্রশ্ন, কমিশন নিজে তদন্ত না করে কীভাবে কার্যকর সুপারিশ করবে?
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কমিশনের আদেশ মানা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিলের ২৭ ধারায় কমিশনের দেওয়া আদেশ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পালনীয় এবং তা অমান্য করলে শাস্তির বিধান রয়েছে।
তবে মানবাধিকারকর্মীদের প্রশ্ন, এই বিধান শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে কীভাবে কার্যকর হবে, তা পরিষ্কার নয়। কারণ, আইনের ২ ধারায় ‘ব্যক্তি’ ও ‘শৃঙ্খলা বাহিনী’র সংজ্ঞা আলাদাভাবে দেওয়া হলেও ২৭ ধারায় কমিশনের আদেশ অমান্য করলে বাহিনী বা বাহিনীর সদস্যের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তির বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি।
মানবাধিকার কমিশনের এক সাবেক সদস্যের মতে, ১৯ ধারায় ‘এই আইনের অন্যান্য ধারায় যা কিছুই থাকুক না কেন’—এ ধরনের ভাষা ব্যবহারের ফলে ওই ধারার বিধানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন না দিলে ২৭ ধারার শাস্তির বিধান সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর করা যাবে কি না, তা নিয়ে আইনি অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে।
সাবেক গুম কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন বলেন, পাস হওয়া বিলে প্রত্যাশিত মাত্রায় কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। তাঁর মতে, কমিশনকে যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া উচিত ছিল। বাহিনীর প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রেও যে বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে, সেখানে এখনও ফাঁক রয়ে গেছে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের বিলেও একই ধরনের অস্পষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। বিলের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগী বা তাঁর পক্ষে অন্য কেউ থানায় মামলা করতে পারবেন। থানা মামলা গ্রহণ না করলে আদালতে নালিশি মামলা করা যাবে। অভিযোগের তদন্ত ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে।
তবে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এমন কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীকে, যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের বাদ দিয়ে অন্য বাহিনীকে। অর্থাৎ কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ থাকলে অন্য বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি অনুসন্ধান করবে।
এ নিয়েও মানবাধিকারকর্মীদের প্রশ্ন—অভিযোগের শুরুতেই তো অনেক সময় জানা থাকে না, কোন বাহিনীর সদস্যরা কাউকে তুলে নিয়ে গেছেন। তাহলে তদন্তের আগেই কীভাবে নির্ধারণ করা হবে কোন বাহিনীকে তদন্ত থেকে বাদ দিতে হবে?
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে সাদা পোশাকে লোকজন কাউকে তুলে নিয়ে গেছে। পরে কোন বাহিনী তাকে আটক বা অপহরণ করেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে ভুক্তভোগী বা তাঁর পরিবার মামলা করবে কার বিরুদ্ধে—এ প্রশ্ন থেকেই যায়। তাঁর অভিযোগ, এই ধরনের অস্পষ্টতা আইনে থেকে যাওয়ায় তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া জটিল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পাস হওয়া বিলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গঠনেও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। চেয়ারম্যানসহ পাঁচ সদস্যের কমিশনে অন্তত একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাখার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তিকে সদস্য করার বিধানও ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে ১০ সদস্যের বাছাই কমিটিতে সরকার বা সরকারি দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে পাঁচজনের।
ফলে সংশোধন ও নতুন বিধান যুক্ত হলেও মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করতে আইনে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।