প্রকাশকালঃ ২৫ জুন ২০২৬, দুপুর ১১:৩৬ সময়

দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী পদ্মা সেতুর চার বছর পূর্ণ হলো আজ বৃহস্পতিবার। ২০২২ সালের ২৬ জুন যান চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সেতুটি ব্যবহার করেছে আড়াই কোটিরও বেশি যানবাহন। এ সময়ে টোল বাবদ আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকার বেশি। তবে আদায়কৃত অর্থের প্রায় অর্ধেকই ব্যয় হয়েছে নির্মাণ ঋণ পরিশোধে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা সেতুর প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা সরকার বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে ঋণ হিসেবে প্রদান করে। বর্তমানে সেতুর ওপর দিয়ে সড়কপথে যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি নিচতলা দিয়ে ট্রেন চলাচল করছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ জানান, পদ্মা সেতু থেকে টোল আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি রাজস্ব অর্জিত হচ্ছে। তবে আর্থিক অর্জনের পাশাপাশি সেতুটি মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করেছে এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হলেও পরদিন ২৬ জুন যান চলাচল শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর সেতুর রেলপথ উদ্বোধনের মাধ্যমে ঢাকা-ভাঙ্গা নতুন রেল নেটওয়ার্ক চালু হয়। ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে ঢাকা থেকে নড়াইল ও যশোর হয়ে খুলনা পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
এর ফলে রাজধানী থেকে খুলনা ও বেনাপোলে পৌঁছাতে সময় কমে এসেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দক্ষিণাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের সুযোগও রাখা হয়েছে।
সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, উদ্বোধনের পর ২০২২ সালে পদ্মা সেতু ব্যবহার করে ২৭ লাখ ৯০ হাজার ৪৬৫টি যানবাহন। ওই বছর টোল আদায় হয় ৪০২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
পরবর্তী বছরগুলোতে টোল আদায়ের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে আদায় হয় ৮১৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ৮৩৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালে ৮৮৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। চলতি বছরের ২৩ জুন পর্যন্ত টোল আদায় হয়েছে ৪৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে চার বছরে মোট টোল আদায় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৯২ কোটি ১৬ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে ২০২৫ সালে সর্বাধিক ৭২ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৭টি যানবাহন সেতুটি ব্যবহার করেছে।
চলতি বছরের ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পদ্মা সেতুতে এক দিনে সর্বোচ্চ যানবাহন পারাপারের রেকর্ড গড়ে। গত ৫ জুন ২৪ ঘণ্টায় ৫২ হাজার ৪৮৭টি যানবাহন সেতু ব্যবহার করে। ওই দিন টোল আদায় হয় ৫ কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা।
এর পরদিন আরও ৪০ হাজার ১১৮টি যানবাহন সেতু পারাপার করে, যেখান থেকে আদায় হয় ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা। এটি পদ্মা সেতুর ইতিহাসে টোল আদায়ের অন্যতম সর্বোচ্চ রেকর্ড।
যানবাহনের দ্রুত পারাপার নিশ্চিত করতে ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতুতে ইলেকট্রনিক টোল সংগ্রহ (ই-টোল) ব্যবস্থা চালু করা হয়। বর্তমানে এ ব্যবস্থায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়েছে এবং এর মাধ্যমে আদায় হয়েছে ৮ কোটি টাকার বেশি টোল।
ই-টোল ব্যবস্থায় নিবন্ধিত যানবাহন নির্ধারিত লেনে প্রবেশ করলে আরএফআইডি প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ি শনাক্ত করা হয়। এরপর নির্ধারিত টোল কেটে নেওয়া হয় এবং ব্যারিয়ার খুলে যায়। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় প্রায় এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ব্যবস্থা শুধু সময় সাশ্রয়ই করছে না, বরং টোল আদায়ে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, যানজট হ্রাস এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও বাড়াচ্ছে।
এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই)-এর হেড অব প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট আবদুল্লাহ আল ফাহিম বলেন, ই-টোল ব্যবস্থার ফলে যাতায়াতে স্বস্তি বেড়েছে, কর্মঘণ্টার অপচয় কমেছে এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়েছে।
এদিকে সেতু কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পদ্মা সেতু থেকে বছরে ১ হাজার ৬০০ কোটির বেশি টোল আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।