প্রকাশকালঃ ৩০ মার্চ ২০২৬, দুপুর ১:১২ সময়

ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি খাতে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলায় একগুচ্ছ সাশ্রয়ী পদক্ষেপ বা কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ চালু করা এবং অফিস সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আংশিকভাবে অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়টিও সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সব সরকারি সংস্থাকে নিজস্ব প্রস্তাব তৈরি করতে বলা হয়েছে। এসব প্রস্তাব আগামী মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আপাতত তিন মাসের একটি স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গ্রহণের কথাও ভাবা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে সরকার এই কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটছে।
কর্মকর্তারা জানান, আলোচনায় থাকা অন্তত আটটি পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে—সাপ্তাহিক ছুটিতে অতিরিক্ত একদিন যুক্ত করা অথবা কর্মকর্তাদের সপ্তাহে দুই দিন ঘরে বসে কাজের সুযোগ দেওয়া। এছাড়া অফিসের কাজের সময় এগিয়ে আনা বা মোট সময় কমানোর প্রস্তাবও রয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহের অর্ধেক ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনায় রয়েছে।
তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কোন পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা হবে, তা মন্ত্রিসভা বৈঠকে নির্ধারিত হবে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। অপ্রয়োজনীয় সরকারি ঋণ এড়ানো এবং কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে আপাতত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায় না সরকার। এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ছয় মাস বা এক বছরের পরিকল্পনাও নিতে হতে পারে।
এদিকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নিজ নিজ কৃচ্ছ্রসাধন পরিকল্পনার খসড়া তৈরি শুরু করেছে। চাহিদাপক্ষ নিয়ন্ত্রণ (ডিমান্ড সাইড ম্যানেজমেন্ট) কৌশলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। কোভিড-১৯ সময়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনে বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠক ডাকা যেতে পারে।
অন্য এক কর্মকর্তা মনে করেন, বর্তমান মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য নতুন হওয়ায় সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কিছুটা ধীর হতে পারে। তিনি অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে অফিসগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয় সংক্রান্ত নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি রাখা এবং অপ্রয়োজনে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখা।
অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার এবং বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রতিটি অফিসে নজরদারি দল গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তেল ও এলএনজি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ সংকটের কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির পরিবর্তে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, আগামী মাসগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কমতে পারে। তবে সম্প্রতি আমদানি করা এলএনজি সময়মতো পৌঁছালে এপ্রিল মাসে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে আশা করা হচ্ছে।