প্রকাশকালঃ ৩ জুন ২০২৬, দুপুর ২:২৪ সময়

ঈদুল আজহার ছুটিতে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের রেড টেলিফোন হঠাৎ অকার্যকর হয়ে পড়ে। এতে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, টেলিফোন লাইনে প্রয়োজনীয় টিউন না থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
পরে সাত ঘণ্টার চেষ্টায় বিটিসিএলের কর্মকর্তারা সংযোগ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের একাধিক সংস্থা বিষয়টি তদন্ত ও অনুসন্ধান করছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা আমার দেশকে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেন।
কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর রেড টেলিফোন একটি উচ্চপর্যায়ের স্পর্শকাতর বিষয়। সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত বিভিন্ন ব্যক্তিসহ রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ লোকজনের সঙ্গে তিনি এই ফোনের মাধ্যমে কথা বলেন এবং তথ্য আদান-প্রদান করে থাকেন। প্রধানমন্ত্রীর রেড টেলিফোনের টিউন গায়েবের ঘটনা স্বাভাবিক নয় বলেও উল্লেখ করেন তারা।
সচিবালয়ে কর্মরত একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা মোটেও কার্যকর নয়। দর্শনার্থী ও সাধারণ মানুষ যখন তখন নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে নির্বিঘ্নে আসা-যাওয়া করছে। সচিবালয়ের অভ্যন্তরে খাওয়া-দাওয়া ও কেনাকাটাও করছে বিনা বাধায়। একটি কার্যকর প্রশাসনিক স্থাপনার জন্য এটি কোনোভাবেই উপযোগী নয় বলে দাবি করেন তারা। কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রী এখন সচিবালয়ে নিয়মিত অফিস করছেন। এ অবস্থায় তার কার্যালয়-উপযোগী করে যে ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথা, তা নেওয়া হয়নি।
সচিবালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকারি ছুটি শুরু হয় ২৫ মে। টানা সাত দিনের ছুটি শেষে গত সোমবার অফিস খোলে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, ওই দিন (সোমবার) সকাল ৮টায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে তার কার্যালয় তদারকি ও পর্যবেক্ষণকালে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর রেড টেলিফোনটির টিউন (সংযোগ) নেই। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানান। পর্যায়ক্রমে তারা বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জানান।
এক কর্মকর্তা জানান, রেড টেলিফোনের টিউন না পাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে একটি টিম টানা সাত ঘণ্টা চেষ্টার পর সংযোগ ফিরে পায়।
এ বিষয়ে বিটিসিএল কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন আমার দেশকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর রেড টেলিফোনে সংযোগ না থাকার বিষয়টি সকাল ৮টার দিকে আমাদের জানানো হয়। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে টেলিফোন সেটসহ এর অন্য বিষয়গুলো পরীক্ষা করে কাজ শুরু করি। সাত ঘণ্টা চেষ্টার পর বেলা ৩টার দিকে সংযোগ দিতে সক্ষম হই।
প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিটিসিএলের এই কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি অনুসন্ধান ও তদন্ত করছে। অনুসন্ধানের পর যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানাবে বলেও জানান তিনি।
বিটিসিএলের অপর এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর রেড টেলিফোনের গুরুত্ব বিবেচনায় এর রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রধানমন্ত্রীর কথোপকথন নিরাপদ রাখার বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করা হয়। এতে ক্রস কানেকশন সম্ভব নয়। টেলিফোনের লাইনের কোথাও ক্রসকানেকশন তৈরি হয়েছে কি না, তদন্ত ও অনুসন্ধান শেষে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
প্রধানমন্ত্রীর রেড টেলিফোনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টি তদন্ত করার জন্য বিটিসিএল থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিটিসিএলের নেওয়া পদক্ষেপের একটি ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়।
ওই ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গত ১ জুন সচিবালয়ের দায়িত্বরত কর্মীরা অফিসে এসে দেখতে পান গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন লাইনগুলো বিকল হয়ে পড়ে আছে। সচিবালয়ের পুরাতন ২ নম্বর ভবন থেকে নতুন ১ নম্বর ভবন পর্যন্ত বিস্তৃত টেলিযোগাযোগের অত্যন্ত মূল্যবান কপার ক্যাবলগুলো ভবনের ছাদ ও সংযোগ লাইনের বিভিন্ন স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন। কোথাও কোথাও তার কাটা অবস্থায় পাওয়া গেছে। কিছু কিছু জায়গায় তার ছিল না। এতে শুধু সাধারণ টেলিফোনই নয়; বরং অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের রেড টেলিফোনসহ গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন সংযোগগুলো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক যোগাযোগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়।
বিটিসিএলের ফোন-৩ শাখার ব্যবস্থাপক নাজিম হায়দারের পাঠানো ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িতদের শনাক্তকরণ এবং অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র উপকমিশনার এনএম নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে যেগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে সচিবালয়ের নিরাপত্তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে বিষয়টি জানানোর পরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সচিবালয়কে এখন আর সংরক্ষিত এলাকা বলা যাচ্ছে না। এখানে যেকোনো মানুষ অবাধে প্রবেশ করার অসংখ্য নজির রয়েছে। নিরাপত্তায় এমন ঢিলেঢালা ভাব প্রশাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সচিবালয়ের চারপাশ ঘিরে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। আন্দোলনকারীরা বিনা বাধায় সচিবালয়ে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে সে সময়ের চেয়ে খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
সচিবালয়ের নিরাপত্তা আরো জোরদার করা প্রয়োজন উল্লেখ করে সচিবালয়ের বিভিন্ন অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-২-এর উপসহকারী প্রকৌশলী এসএম ফিরোজ আমার দেশকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সচিবালয়ের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর রেড টেলিফোন বিকল হওয়ার বিষয়টিকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তারা। এ দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার জন্য পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চসহ বিভিন্ন সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।