প্রকাশকালঃ ২৫ এপ্রিল ২০২৬, দুপুর ১:৪৫ সময়

দেশের কৃষি অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত সার বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ে এই মুহূর্তে জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে প্রান্তিক কৃষকের উঠান পর্যন্ত আলোচনা উত্তাল।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্যের আবেগঘন বক্তৃতা এবং চিফ হুইপের প্রস্তাবের পর সারের ডিলারশিপ বাতিল ও নতুন নিয়োগের বিষয়টি বর্তমানে দেশের প্রধান আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে বিগত সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত সকল ডিলারশিপ বাতিলের প্রস্তাব এবং তাতে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নীতিগত সম্মতির পর সংশ্লিষ্ট মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে যেমন সিন্ডিকেট ভাঙার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ডিলার ও সাধারণ কৃষকদের মধ্যে দানা বাঁধছে আশঙ্কা।
গত বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে একজন সংসদ সদস্য সারের ডিলারদের দৌরাত্ম্য ও সিন্ডিকেট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের জিম্মি করে রেখেছে।
তার এই বক্তব্যের পর চিফ হুইপ সরাসরি স্পিকারের কাছে প্রস্তাব করেন যে, বিগত সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত সব ডিলারশিপ বাতিল করে নতুন করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ডিলার নিয়োগ দেওয়া হোক।
সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে জানান, জনগণের সরকার কোনোভাবেই সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দেবে না। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে পুরো ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা হবে। তবে সরকারের এই অনড় অবস্থানের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে, যাচাই-বাছাই ছাড়া ঢালাওভাবে বাতিল করা কি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে?
সরকারের এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন কৃষিবিদ ইমদাদুল হক। তার মতে, সংস্কার প্রয়োজন, কিন্তু সেটি হতে হবে তথ্যনির্ভর এবং পরিকল্পিত। তিনি জানান, বিগত সরকারের আমলে অনেকে রাজনৈতিক প্রভাবে ডিলারশিপ পেয়েছে এটা সত্য, কিন্তু এমন অনেক ডিলার আছেন যারা দীর্ঘ ২০-৩০ বছর ধরে সুনামের সাথে ব্যবসা করছেন। তাদের সাথে কৃষকের নাড়ির সম্পর্ক। ঢালাওভাবে ডিলারশিপ বাতিল করলে বাজারে কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। হঠাৎ করে নতুন ও অনভিজ্ঞ ডিলাররা এলে তারা কৃষকের চাহিদা এবং বণ্টন ব্যবস্থা সামলাতে হিমশিম খাবে।
তিনি আরও যোগ করেন, সরকার যদি যাচাই-বাছাই না করে কেবল পূর্ববর্তী আমল বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়, তবে বিগত সরকারের ভুল ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের সাথে বর্তমান জনবান্ধব সরকারের পার্থক্য কোথায় থাকবে? পলাতক সরকার ভুল করেছিল বলেই জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। বর্তমান সরকারের উচিত সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা।
গ্রামাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা কেবল নগদ লেনদেনে চলে না, এটি মূলত বিশ্বাসের ওপর টিকে আছে। প্রান্তিক কৃষক মোহাম্মদ সলিম জানান, তারা দীর্ঘ বছর ধরে এলাকার ডিলারের কাছ থেকে সার নিচ্ছেন। কৃষকদের পকেটে সবসময় টাকা থাকে না বলে ডিলাররা বাকি ও নানা সুবিধা দেন। ফসল ঘরে উঠলে তারা সেই টাকা পরিশোধ করেন। পুরাতন ডিলাররা জানেন কোন মৌসুমে কোন সারটি বেশি লাগে। নতুন কেউ এলে এই পুরো বিষয় বুঝতে বুঝতে এক মৌসুম পার হয়ে যাবে, যা ফসলের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সরকারের ভেতর থেকেই দাবি উঠেছে যে, সব ডিলারকে বাতিল না করে নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতে শুদ্ধি অভিযান চালানো হোক। বিশেষ করে যারা বাসস্থান ও কর্মস্থলের অমিল থাকা সত্ত্বেও ডিলারশিপ দখল করে আছেন, যাদের পরিবারে একাধিক ডিলারশিপ রয়েছে, যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের দাম বাড়াচ্ছে কিংবা যারা সরাসরি কৃষিকাজের সাথে জড়িত না থেকে কেবল দলীয় প্রভাবে ডিলারশিপ নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কৃষিবিদ ইমদাদুল হকের মতে, সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা এবং কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রতিটি ডিলারের আমলনামা তদন্ত করা উচিত। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই, যারা কৃষকের কাছে জনপ্রিয় এবং নিয়মিত সার সরবরাহ করছেন, তারা যেন রাজনৈতিক রোষানলের শিকার না হন।
সংসদে ডিলার বাতিলের প্রস্তাবটি আসার পর অনেকেই মনে করছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ এলাকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা নিজেদের অনুসারীদের নতুন ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। দেশের সচেতন নাগরিক ও কৃষিজীবীদের দাবি, সার ডিলারশিপ যেন কোনোভাবেই রাজনীতির বলি না হয়।
ডিলারের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচ্য না হয়ে তার সততা ও কর্মদক্ষতা হওয়া উচিত একমাত্র মাপকাঠি। যদি কোনো ডিলার সারের সংকট তৈরি করে সরকারের সুনাম নষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তার ডিলারশিপ বাতিল করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হোক, এতে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রোশে বা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিরপরাধ অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের বাদ দিলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
বর্তমান সরকারকে দেশের মানুষ জনগণের সরকার হিসেবে নির্বাচিত করেছে। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সারের ডিলার এবং সাধারণ কৃষকদের পক্ষ থেকে আকুল আবেদন জানানো হয়েছে যেন ঢালাও বাতিলের পরিবর্তে গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং কোটি কোটি টাকার লেনদেনের চেইন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে নজর দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে সারের ডিলাররা কেবল ব্যবসায়ী নন, তারা কৃষি বিপণন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সরকার পরিবর্তন হলে ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন, কিন্তু সেই সংস্কার যেন ধ্বংসাত্মক না হয়। সারের বাজারে কোনো সিন্ডিকেটকে ছাড় দেওয়া যেমন উচিত নয়, তেমনি স্বচ্ছ ও সৎ ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক বলির পাঁঠা বানানোও কাম্য নয়। জনবান্ধব সরকার যদি মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং কৃষিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী তদন্ত সাপেক্ষে পদক্ষেপ নেয়, তবেই কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে।
অন্যথায়, হুট করে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্ত কৃষি উৎপাদন এবং সরকারের জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। দেশের মানুষ আশা করে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেধা ও বিচক্ষণতার সাথে এই সংকট নিরসন করবেন এবং একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন।