প্রকাশকালঃ ৩০ মার্চ ২০২৬, দুপুর ১২:০৪ সময়

বৈশ্বিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার— এই তিনের সমন্বয়েই নির্ধারিত হবে আগামী বাজেটের রূপরেখা। এ ক্ষেত্রে বাস্তবতা বিবেচনায় সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। বাজেট পরিকল্পনায় অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। বরং রাজস্ব আদায়ের বাস্তব সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম বিবেচনায় রেখে ব্যয় কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থনীতিবিদরা এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। গত শনিবার প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অর্থ মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকের শুরুতে অর্থমন্ত্রী দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কর-রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরেন। পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রকল্প গ্রহণ ও প্রাক্কলন প্রক্রিয়া উন্নত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। একই সঙ্গে দেশের পুঁজিবাজার এখনও উন্নত নয় উল্লেখ করে একে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, সে বিষয়েও পরামর্শ চান তিনি।
বৈঠকে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই অতিরিক্ত আশাবাদিতা পরিহার করে বাস্তব সক্ষমতার ভিত্তিতে রাজস্ব ও ব্যয়ের কাঠামো নির্ধারণের পরামর্শ দেন তারা।
বৈঠক সূত্র জানায়, আলোচনায় সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আলোচনায় অংশ নেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমকালকে তিনি বলেন, আগামী বাজেটে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে সামাজিক খাতে সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে উন্নয়ন ব্যয়ও বাড়াতে হবে। কিন্তু এর বিপরীতে পর্যাপ্ত রাজস্ব থাকবে কিনা, সেটিই মূল প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ নিম্নমুখী থাকায় কর আহরণে চাপ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সঠিক রাজস্ব কাঠামো ও ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থায়ন পরিকল্পনা জরুরি। নতুন বড় মেগা প্রকল্প নেওয়ার সময় এখন নয়, যেসব প্রকল্পের অগ্রগতি ৮০ শতাংশের বেশি, সেগুলো দ্রুত শেষ করতে হবে। আর কম অগ্রগতির প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করে প্রয়োজন হলে স্থগিত রাখা উচিত।
বাজেটের আকার নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, বাজেট খুব বড় বা খুব ছোট— কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়। অতিরিক্ত সংকোচন হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না, আবার বড় বাজেটের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদও নেই। তাই বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়ন জরুরি।
তিনি বলেন, ব্যাংকনির্ভর ঋণ বাড়ালে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ে। তাই পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহারে সতর্কতা এবং জ্বালানি আমদানির মতো খাতে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অর্থায়ন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও বেকারত্ব বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বাজেটের মূল লক্ষ্য হিসেবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেন তিনি।
এলডিসি উত্তরণের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণ, পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমানো, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি। সরকারি ও বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেন। সুদের হার কমানো নিয়ে ভিন্ন মত থাকলেও বর্তমান অনিশ্চয়তায় সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদও প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেন। জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত অস্থির ও অনিশ্চিত। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাজেট প্রণয়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ প্রাক্কলন যে কোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাস্তবতা ভিন্ন হয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এখন স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজেটের আকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বছরের বাজেট খুব বড় করা উচিত নয়, কারণ বড় বাজেটে অপচয়ের ঝুঁকি থাকে। তাই সংকোচনমূলক বাজেট ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ জরুরি। মূল্যস্ফীতি ৬-৭ শতাংশের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা উচিত। রাজস্ব আহরণ, বরাদ্দ ও ব্যয় সক্ষমতা— সবখানেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মাহবুব আহমেদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি, জ্বালানি (নবায়নযোগ্যসহ), শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। আর ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সময়মতো অর্থছাড়, দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলো ঝুঁকিমুক্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বেশি বিনিয়োগ করায় বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কর রাজস্ব বৃদ্ধি ও পুঁজিবাজার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
