প্রকাশকালঃ ১৪ মে ২০২৬, দুপুর ১১:৩১ সময়

একসময় গ্রামবাংলার পরিচিত ও জনপ্রিয় ফল ছিল গোলাপ জাম। নব্বইয়ের দশক কিংবা তার আগের প্রজন্মের শৈশব স্মৃতিতে এই ফলের বিশেষ জায়গা রয়েছে। স্কুল ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে গাছ থেকে পেড়ে তাজা গোলাপ জাম খাওয়া ছিল গ্রামীণ জীবনের এক আনন্দঘন অভ্যাস। পাকা ফল হাতে নিয়ে ভেতরের বীজের খটখট শব্দ শোনা কিংবা কামড় দিতেই ছড়িয়ে পড়া গোলাপের মতো মিষ্টি ঘ্রাণ আজও অনেকের স্মৃতিতে অমলিন। অথচ সময়ের পরিবর্তনে একসময়ের পরিচিত এই ফল এখন বিলুপ্তির পথে।
গোলাপ জামের বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium jambos। এটি Myrtaceae গোত্রের একটি চিরসবুজ বৃক্ষ। বিভিন্ন অঞ্চলে এটি রোজ অ্যাপল, মালাবার প্লাম কিংবা মেওয়া ফল নামেও পরিচিত। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ফিলিপাইন, চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় এই ফলের চাষ দেখা যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, একসময় রাজা-বাদশাহদের অন্দরমহলেও গোলাপ জাম ছিল অত্যন্ত প্রিয় ফল।
মাঝারি আকৃতির এ গাছের কাণ্ড ধূসর ও মসৃণ। সাধারণত একটি গাছ ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। রোপণের দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই ফল ধরা শুরু হয়। পাতাগুলো দেখতে অনেকটা জাম পাতার মতো, গাঢ় সবুজ ও বিপরীত বিন্যাসে সাজানো। সাদা রঙের ফুলগুলো অনেকটা জামরুল ফুলের মতো দেখতে।
গোলাপ জাম আকারে ছোট পেয়ারার মতো গোলাকার এবং অত্যন্ত মসৃণ ত্বকবিশিষ্ট। কাঁচা অবস্থায় ফল সবুজ ও শক্ত থাকলেও পাকলে সাদাটে, হালকা হলুদ কিংবা গোলাপি আভাযুক্ত রঙ ধারণ করে। ফলের ভেতরে সাধারণত একটি বা দুটি বীজ থাকে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, পাকা ফল থেকে গোলাপের মতো সুগন্ধ বের হয়। খাওয়ার সময়ও গোলাপজলের মতো মিষ্টি সুবাস অনুভূত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর খুব কম ফলেই এমন স্বতন্ত্র ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
সাধারণত মাঘ-ফাল্গুন মাসে এ গাছে ফুল আসে এবং বৈশাখ থেকে শ্রাবণের মধ্যে ফল পাকে। ফল পাকার আগেই পাখি, বাদুড়সহ নানা প্রাণী এই ফল খেতে শুরু করে। এজন্য পরিবেশবান্ধব ও বন্যপ্রাণী সহায়ক উদ্ভিদ হিসেবেও গোলাপ জাম পরিচিত।
পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ এই ফলে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন বি-১ ও বি-২, ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা ফলে প্রায় ১০৫ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়। এছাড়া এর ছাল, পাতা, বীজ ও ফল বিভিন্ন ভেষজ গুণে সমৃদ্ধ। ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, বমিভাব ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এটি উপকারী বলে জানা যায়। গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতেও সহায়তা করে গোলাপ জাম।
তবে আধুনিক সময়ে গ্রামাঞ্চলে এই গাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। ফলে বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিশুই গোলাপ জাম সম্পর্কে তেমন পরিচিত নয়। পরিবেশবিদদের মতে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও দেশীয় ফলের ঐতিহ্য ধরে রাখতে গোলাপ জাম গাছ সংরক্ষণ ও নতুন করে রোপণ জরুরি। বিশেষ করে বৃহৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে দেশীয় ফলজ গাছের পাশাপাশি গোলাপ জাম অন্তর্ভুক্ত করা হলে হারিয়ে যেতে বসা এই ফল আবারও ছড়িয়ে পড়তে পারে গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে। তখন হয়তো আবারও গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলবে সুগন্ধি গোলাপ জাম।