রায়হান চৌধুরী, মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:
পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচাতে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে যে ছেলেকে প্রবাসে পাঠানো হয়েছিল, সেই ছেলেই ফিরছে লাশ হয়ে। এমন নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি কুমিল্লার মুরাদনগরের একটি পরিবার। সৌদি আরবে পৌঁছানোর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রহস্যজনকভাবে মারা গেছেন রিফাত (২৩)। আকস্মিক এই মৃত্যুতে শোকের পাশাপাশি পাহাড়সম ঋণের বোঝা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবারটি।
রিফাত মুরাদনগর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের মোচাগড়া গ্রামের বাসিন্দা। গত ৪ ফেব্রুয়ারি ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে তিনি সৌদি আরবের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। পরিবার জানিয়েছে, পরদিন ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে মদিনা এলাকা থেকে তার মৃত্যুর খবর আসে। কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পায়নি পরিবার।
নিহত রিফাত ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবা মো. কাদের দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন, মা তাসলিমা বেগম গৃহিণী। রিফাতের ওপরই নির্ভর ছিল তিন বোনের পড়াশোনা ও বিয়ের ভবিষ্যৎ। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে ভিটেমাটি বন্ধক রেখে, আত্মীয়-স্বজন ও মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা তুলতে হয় পরিবারকে।
মা তাসলিমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। কিন্তু শেষবারের মতো তার মুখটা দেখার অধিকারটুকু চাই। সরকারের কাছে আমাদের একটাই আবেদন—আমার ছেলের লাশটা দেশে এনে দিন।”
বাবা মো. কাদের বলেন, “ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম ভালো দিনের আশায়। সে একদিনও প্রবাসে থাকতে পারল না। এখন এই সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা কে শোধ করবে? আমি শুধু চাই, আমার ছেলের লাশটা যেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।”
পরিবারের অভিযোগ, বিদেশে যাওয়ার একদিনের মাথায় এমন মৃত্যু স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে রিফাতের মরদেহ সৌদি আরবের একটি হাসপাতালের মর্গে রাখা রয়েছে।
কুমিল্লা জেলা প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক মাইন উদ্দিন জানান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান বলেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় মরদেহ দেশে আনার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।
স্বপ্নভাঙা এই পরিবারের এখন একটাই দাবি—প্রবাসের মাটিতে পড়ে থাকা সন্তানের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হোক এবং তার অকালমৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা হোক।
















