প্রকাশকালঃ ৩ জুন ২০২৬, দুপুর ১১:১৬ সময়

বর্ষার আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গেই দেশজুড়ে নতুন করে জেঁকে বসছে এক অদৃশ্য আতঙ্কের নাম ‘ডেঙ্গু’। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সম্প্রতি পর্যবেক্ষণ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ডেঙ্গু মহামারি ছড়িয়ে দেয়ার জন্য অতিমাত্রায় অনুকূল। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে আক্রান্তের হার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে মনে হলেও, জুন মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়কালকে এডিসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত কয়েক বছরে রাজধানী ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে গ্রাম থেকে শহর সবখানেই বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর যে ভয়াবহ তাণ্ডব দেশবাসী দেখেছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঘটার শঙ্কা থেকে রক্ষা পেতে এখন কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মাঠপর্যায়েমশকনিধন অভিযানের সঠিক বাস্তবায়ন এবং প্রতিটি নাগরিকের সর্বাত্মক সচেতনতা।
অকাল বৃষ্টিপাত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জমে থাকা স্বচ্ছ পানির অভাবনীয় উৎসগুলো ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে এক জাতীয় সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সময়মতো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এবং সমন্বিত মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার না করলে চলতি বছরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার চরম ঝুঁকির মুখে দেশ। চলতি বছরের শুরু থেকেই ডেঙ্গুর মৃদু উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বছরের প্রথম সাড়ে চার মাসে (১২ মে পর্যন্ত) দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ২ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ২ এবং মে মাসের প্রথমার্ধে ১ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ২ হাজার ৭৫৪ জন রোগী।
মাসভিত্তিক হাসপাতালে ভর্তি- জানুয়ারি ১,০৮১ জন, ফেব্রুয়ারি ৪০৯, মার্চ ৩৫৩, এপ্রিল ৬৪০, মে (প্রথম ১২ দিন) ২৭১ জন। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, মে মাস পর্যন্ত এই সংখ্যা কম মনে হলেও জুনের বৃষ্টিপাত শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই এই চিত্র দ্রুত বদলে যেতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গু কেবল রাজধানী ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয় এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। বিগত বছরের (২০২৫) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই ভয়াবহতার চিত্র পরিষ্কার হয়। গত বছর দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ভর্তি হন ৩১,৬৮২ জন (যা মোট রোগীর ৩০.৮০ শতাংশ)। অর্থাৎ, বাকি ৭৯.২৪ শতাংশ রোগীই ছিল ঢাকার বাইরের।
আরও সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট আক্রান্তের মাত্র ৬.৩৯ শতাংশ প্রকৃত রাজধানীর স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন, বাকি ৯৩.৬১ শতাংশ রোগী ঢাকার বাইরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আক্রান্ত হয়েছেন। বিগত বছরে দেশের ৮টি জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার থেকে ১০ হাজারের ঘর ছুঁয়েছিল। জেলাভিত্তিক সংক্রমণের শীর্ষে ছিল বরিশাল বিভাগের বরগুনা, যেখানে সর্বোচ্চ ৯,৫৩৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।
অন্যান্য প্রধান জেলাগুলোর চিত্র ছিল- গাজীপুরে ৪,৭৫৪ জন, চট্টগ্রাম ৪,৭২৯, পটুয়াখালী ৪,৫৯৩, বরিশাল ৪,০৫৩, ময়মনসিংহ ৩,০০৭, কুমিল্লা ৩,০০০, মানিকগঞ্জ ২,৪১৩ জন। এ ছাড়াও খুলনা, যশোর, মাদারীপুর, রাজশাহীসহ দেশের ৪৩টিরও বেশি জেলায় ডেঙ্গু মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। ঢাকার বাইরে মশকনিধন কার্যক্রম দৃশ্যমান না হওয়ায় এ বছরও ঢাকার বাইরের জেলাগুলো চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ গত কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।
২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃত্যুর খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এডিস মশার কামড়ে মৃত্যুর হার কতটা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে- ২০১৯ সালে হাসপাতালে ভর্তি ১,০১,৩৭৪ জন। আইইডিসিআর কর্তৃক নিশ্চিতকৃত মৃত্যু ১৬৪ জন। (প্রতি ৬১৮ জন রোগীর বিপরীতে ১ জনের মৃত্যু)। ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে ডেঙ্গু সনাক্তকরণে নজর কম ছিল। ২০২১ সালে হাসপাতালে ভর্তি ২৮,৪২৯ জন, মৃত্যু ১০৫ জনের। (প্রতি ২৭০ জনে ১ জনের মৃত্যু)। ২০২২ সালে হাসপাতালে ভর্তি ৬২,৩৮২ জন, মৃত্যু ২৮১ জনের। (প্রতি ২২২ জনে ১ জনের মৃত্যু)। ২০২৩ সাল (ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বছর) হাসপাতালে ভর্তি ৩ লাখ ২১,১৭৯ জন এবং রেকর্ড ১,৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। (প্রতি ১৮৮ জনে ১ জনের মৃত্যু)।
২০২৪ সালে হাসপাতালে ভর্তি ১,০১,২১৪ জন, মৃত্যু ৫৭৫ জনের। (প্রতি ২৩৪ জনে ১ জনের মৃত্যু)। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি ১,০২,৮৬১ জন, মৃত্যু ৪১৩ জনের। (প্রতি ২৪৯ জনে ১ জনের মৃত্যু)। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালের পর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আক্রান্ত কিছুটা কমলেও মৃত্যুর হার ২০১৯ বা ২০২১ সালের তুলনায় অনেক বেশি ছিল, যা ভাইরাসের ধরন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবার আগেভাগেই মাঠে নেমেছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। তবে ঢাকার বাইরের পৌরসভা বা জেলা শহরগুলোয় এই কার্যক্রম এখনো স্থবির। ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রথমবারের মতো লার্ভার বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসি’র (রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা) সহযোগিতায় ১২ দিনব্যাপী একটি বিশেষ জরিপ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
ডিএসসিসির ভারপ্রাপ্ত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন এই জরিপ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা প্রথমবারের মতো ৭৫টি ওয়ার্ডে লার্ভার ঘনত্ব মাপার জন্য বিশেষ জরিপ করছি। এর মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হবে, যা কোন ওয়ার্ড বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কোনটি মধ্যম এবং কোনটি স্বাভাবিক তা চিহ্নিত করবে। এর ফলে আমরা ঢালাওভাবে ওষুধ না ছিটিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক (টার্গেটেড) কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারব। তবে শুধু ওষুধ দিয়ে এডিস মারা সম্ভব নয়, নাগরিকদের নিজেদের আঙিনা পরিষ্কার রাখতে সচেতন হতে হবে।’
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি এলাকার সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি সপ্তাহের শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গত ১৪ মার্চ থেকে দেশব্যাপী এই ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হলেও দুঃখজনকভাবে মাত্র দুই সপ্তাহ পর এই অভিযানের ধারাবাহিকতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়, যা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বড় চিন্তার কারণ। ডেঙ্গুর এই আসন্ন ভয়াবহতা স্বীকার করে নিয়েছেন বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
সম্প্রতি সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। হামের টিকার সুব্যবস্থা করা গেলেও সামনে ডেঙ্গু, পোলিও এবং হান্টাসহ বেশ কিছু সংক্রামক রোগ চোখ রাঙাচ্ছে। ডেঙ্গু চিকিৎসায় সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে মন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বর্ষা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে প্রয়োজন অনুযায়ী ফিল্ড হাসপাতালের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে এবং ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
সর্বোপরি, চলতি বছরের ডেঙ্গু মৌসুম মাত্র শুরু হতে যাচ্ছে, অথচ মে মাস পর্যন্ত আক্রান্ত ও মশার ঘনত্বের যে সূচক, তা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন লার্ভা জরিপ ও পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি নিয়ে কিছুটা তৎপর হলেও, বিগত বছরের সিংহভাগ ডেঙ্গু রোগী যে ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে এসেছে, সেই ঢাকার বাইরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পুরোপুরি ঘুমিয়ে আছে।
ডেঙ্গুর মতো একটি প্রাণঘাতী উৎসব রুখতে কেবল ঢাকা কেন্দ্রিক পরিকল্পনা করলে চলবে না; সমগ্র দেশে একযোগে মশকনিধন অভিযান চালাতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে, যাতে নিজেদের বাড়ি বা ছাদবাগানে পানি জমে এডিসের প্রজননক্ষেত্র তৈরি না হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন প্রশাসনের আগাম প্রস্তুতি এবং জনগণের সচেতনতাই পারে চব্বিশ বা পঁচিশের মতো আরেকটি ডেঙ্গু ট্র্যাজেডি থেকে দেশকে রক্ষা করতে।