প্রকাশকালঃ ৩ মে ২০২৬, বিকাল ৬:০৬ সময়

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল আইনি সুরক্ষা বা সরকারি সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি টিকে থাকে সত্যের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশের ওপর। যদি করপোরেট মালিকানা বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় 'খণ্ডিত সত্য' পরিবেশন করা হয়, তবে তাকে কোনোভাবেই স্বাধীন সাংবাদিকতা বলা যায় না।
রোববার বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম কাঠামোর বর্তমান সংকট নিয়ে এভাবেই নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ।
রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এই সভায় দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা, সাংবাদিকদের অধিকার এবং সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ তাঁর বক্তব্যে বর্তমান সাংবাদিকতার একটি ভয়াবহ দিক উন্মোচন করেন। তিনি জানান, ২০১২ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের মধ্যে 'সেলফ-সেন্সরশিপ' বা স্ব-নিয়ন্ত্রণারোপের প্রবণতা ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব দৃশ্যমান।
কামাল আহমেদের প্রধান পর্যবেক্ষণসমূহ:
মালিকপক্ষের প্রভাব: অনেক সময় গণমাধ্যম মালিকদের বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সাংবাদিকরা পূর্ণাঙ্গ সত্য প্রকাশ করতে পারেন না। এই খণ্ডিত সংবাদ পরিবেশন জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে লুণ্ঠন করে।
নিজস্ব নীতিমালা: প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের একটি নিজস্ব ও স্বচ্ছ সম্পাদকীয় নীতিমালা থাকা জরুরি, যা যেকোনো পরিস্থিতিতে সাংবাদিকের পেশাদারিত্বকে সুরক্ষা দেবে।
স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন: সরকারি প্রভাবমুক্ত একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি, যা দীর্ঘমেয়াদে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।
আলোচনা সভায় ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি) এর চেয়ারম্যান ফাহিম আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গণমাধ্যমকে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণমাধ্যম সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করলেও সেই কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
বিজেসি চেয়ারম্যানের প্রস্তাবনা:
১. বেতন কাঠামো নিশ্চিতকরণ: সম্প্রচার কর্মীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ বেতন কাঠামো অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. টেলিভিশন ডিজিটালাইজেশন: ব্রডকাস্ট মিডিয়াকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনতে হবে যাতে বিজ্ঞাপন নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করা যায়।
৩. রিপোর্ট বাস্তবায়ন: সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট যেন হিমাগারে পড়ে না থাকে, তার জন্য দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যেমন বিটিভি ও বেতারকে কোনো বিশেষ দলের প্রচারযন্ত্র না বানিয়ে জনগণের সেবায় নিয়োজিত করা হবে।
বর্তমানে যে সকল সাংবাদিক আটক রয়েছেন, তাদের বিষয়ে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)-এর সাথে প্রধানমন্ত্রীর ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। দ্রুতই এ বিষয়ে ইতিবাচক সমাধান আসতে পারে।
গুজব রোধে এবং খবরের সত্যতা যাচাইয়ে স্কুল পর্যায় থেকেই 'মিডিয়া লিটারেসি' বা গণমাধ্যম সচেতনতা নিয়ে কাজ শুরু করছে সরকার।
উপদেষ্টা আহ্বান জানান যে, সরকার গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চায় না। সরকারের যেকোনো যৌক্তিক সমালোচনা করার জন্য গণমাধ্যমকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকতার অন্দরমহলে চলমান 'দলীয়করণ' নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে সাংবাদিকতায় রাজনৈতিক বিভাজন বা দলীয়করণ চলায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়া ডিজিটাল আইনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এমন কোনো আইন করা উচিত নয় যা মানুষের মৌলিক অধিকার বা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে। একটি স্বাধীন পরিবেশে সাংবাদিকরা যাতে নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে জার্মানির রাষ্ট্রদূত বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চিত্রটি মোটেও সন্তোষজনক নয়। একটি সমৃদ্ধ গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী ও সমালোচক গণমাধ্যম অত্যন্ত অপরিহার্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করবে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৬-এর এই আলোচনা সভা এটিই স্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সংস্কারের সম্ভাবনা, অন্যদিকে বাস্তবায়নের মন্থর গতি। সাংবাদিকদের ওপর থেকে অযাচিত আইনি চাপ কমানো এবং মালিকপক্ষের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা না গেলে ‘মুক্ত গণমাধ্যম’ কেবল দিবসের স্লোগান হয়েই থাকবে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ এবং সাহসী সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি হবে, এটাই এখন সংবাদকর্মীদের প্রত্যাশা। সরকারের নীতিগত অবস্থান এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোই হবে আগামী দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।