প্রকাশকালঃ ৭ মে ২০২৬, বিকাল ৬:১৯ সময়

বাংলাদেশ ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের আক্ষেপের নাম টেস্ট ফরম্যাট। সাদা পোশাকে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের সম্ভাবনা জাগিয়েও বারবার খেই হারিয়ে ফেলার চিত্র ভক্তদের জন্য নতুন কিছু নয়। তবে ২০২৬ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের নতুন চক্রকে সামনে রেখে বদলে যাওয়ার বার্তা দিলেন টাইগার অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
পাকিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন মিরপুর টেস্টের আগে সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক স্পষ্ট করে দিয়েছেন তার রণকৌশল। সময় বা ওভারের হিসাব নয়, শান্তর মূল চাওয়া, প্রথম ইনিংসে স্কোরবোর্ডে অন্তত ৪০০ রান।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ দল বিদেশের মাটিতে গত ছয়টি টেস্টের মধ্যে তিনটিতে জয়লাভ করেছে। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে ঘরের মাঠে সমান সংখ্যক ম্যাচে জয় মাত্র একটিতে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গত চক্রের এই চিত্র মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। কেন নিজেদের চেনা কন্ডিশনে বাংলাদেশ তাল হারিয়ে ফেলছে, তা নিয়ে ক্রিকেট মহলে আলোচনার শেষ নেই।
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত আজকের সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক নাজমুল হোসেনকে এই নির্দিষ্ট সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। উত্তরে অধিনায়ক বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেন, "অধিনায়ক হিসেবে এই নতুন চক্রে আমার প্রধান লক্ষ্য থাকবে ঘরের মাঠে জয়ের ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা। বিদেশের মাটির সাফল্যকে আমরা ঘরের মাঠেও অনুবাদ করতে চাই।তবে জয়ের জন্য যে ভিত প্রয়োজন, সেটি যে ব্যাটসম্যানদের ওপর নির্ভর করছে, তাও মনে করিয়ে দেন তিনি।
গত টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল চরম হতাশাজনক। ঘরের মাঠে খেলা ৬টি টেস্টে দল মাত্র একবার ৩০০ রানের গণ্ডি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ৩১০ রান এসেছিল, যা ছিল একমাত্র উজ্জ্বল মুহূর্ত। বাকি ম্যাচগুলোর কোনোটিতেই দল ২০০ রানও স্পর্শ করতে পারেনি। ব্যাটিংয়ের এই নাজুক অবস্থাই যে হারের অন্যতম প্রধান কারণ, তা অধিনায়ক নিজেও উপলব্ধি করছেন।
শান্ত বলেন, প্রথম ইনিংসে বড় সংগ্রহ গড়া আমাদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আমি চাই প্রথম ইনিংসে আমরা যেন ভালো ক্রিকেট খেলি এবং বড় লক্ষ্য তাড়া না করে বরং বড় লক্ষ্য স্থাপন করি। স্কোরবোর্ডে যদি আমরা ৪০০ বা তার বেশি রান তুলতে পারি, তবে বোলারদের জন্য কাজটা সহজ হয়ে যায়।
মজার ব্যাপার হলো, দ্রুত রান তোলা বা রক্ষণাত্মক ব্যাটিং, কোনোটি নিয়েই আপত্তি নেই অধিনায়কের। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রান আসাটাই আসল। তার ভাষায়, ‘একেকজন ব্যাটসম্যানের খেলার ধরন একেক রকম। আমি কাউকে তার স্বাভাবিক স্টাইল পরিবর্তন করতে বলব না। কেউ যদি ৮০ ওভারে ৪০০ রান তুলে ফেলে, আমার সমস্যা নেই। আবার কেউ যদি ১২০ ওভার খেলে সেই একই রান তোলে, তাতেও আমি সন্তুষ্ট। মূল কথা হলো বোর্ডে রান থাকতে হবে।
বাংলাদেশ দলে এখন অভিজ্ঞতার অভাব নেই। বর্তমান স্কোয়াডে থাকা তানজিদ হাসান ও অমিত হাসান বাদে প্রায় সব ব্যাটসম্যানেরই ২০টির বেশি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে এই অভিজ্ঞতার বড় অংশই এসেছে বিদেশের প্রতিকূল কন্ডিশনে। এখন সময় এসেছে ঘরের মাঠে সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটানোর।
বিশেষ করে পাকিস্তানের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের উইকেটে স্পোর্টিং উইকেটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ব্যাটসম্যান এবং বোলার উভয়েই এখান থেকে সমান সুবিধা পাবেন। অধিনায়ক নাজমুল মনে করেন, মিরপুরের উইকেট এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যাটিং সহায়ক হয়ে উঠছে, যা সম্প্রতি সাদা বলের ক্রিকেটে লক্ষ্য করা গেছে। তিনি আশা করছেন, এই পরিবর্তনের সুবিধা ব্যাটসম্যানরা নিতে পারবেন।
পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই সিরিজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাওয়ালপিন্ডিতে গত সিরিজে পাকিস্তানকে তাদের মাটিতেই দুবার হারানোর স্মৃতি এখনো টাটকা। তবে ঘরের মাঠে পাকিস্তান সবসময়ই শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। অধিনায়ক শান মাসুদের নেতৃত্বে পাকিস্তান দল মিরপুরে জয়ের লক্ষ্যেই মাঠে নামবে। ট্রফি উন্মোচনের সময় দুই অধিনায়কের শরীরী ভাষাতেই জয়ের আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠছিল।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, দলের ব্যাটিং অর্ডারে ভারসাম্য আনতে বেশ কিছু কৌশলগত পরিবর্তন আনা হতে পারে। বিশেষ করে টপ অর্ডারে যারা দ্রুত রান তুলতে পারেন এবং মিডল অর্ডারে যারা ইনিংস মেরামত করতে জানেন, তাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ সাজানোর পরিকল্পনা চলছে।
আগামীকাল, ৮ মে ২০২৬ থেকে মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে শুরু হবে সিরিজের প্রথম টেস্ট। দুই দলের জন্যই এটি চ্যাম্পিয়নশিপ টেবিলের উপরের দিকে ওঠার লড়াই। এরপর ১৬ মে থেকে সিলেটে শুরু হবে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট।
নাজমুল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল কি পারবে ঘরের মাঠে তাদের এই ঐতিহাসিক ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে? ৪০০ রানের লক্ষ্য কি কেবল স্বপ্ন হয়েই থাকবে নাকি ব্যাটসম্যানরা অধিনায়কের আস্থার প্রতিদান দিতে পারবেন? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী কয়েক দিনের ২২ গজে। তবে শান্তর কথায় একটি বিষয় পরিষ্কার, বাংলাদেশ এখন কেবল লড়াই করতে নয়, দাপটের সঙ্গে জিততে চায়। আর সেই জয়ের মূল চাবিকাঠি হলো বড় স্কোরিং ইনিংস।
ব্যাটসম্যানরা যদি ৮০ কিংবা ১২০ ওভার, যেকোনো উপায়েই ৪০০ রানের কোটা পূর্ণ করতে পারেন, তবে পাকিস্তান সিরিজে জয়ের পাল্লা বাংলাদেশের দিকেই ভারী থাকবে। মিরপুরের আকাশ এখন প্রত্যাশা আর উত্তেজনায় ঘেরা। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কাল সকালেই মাঠে গড়াবে লাল বলের উত্তেজনা।