প্রকাশকালঃ ৯ জুন ২০২৬, দুপুর ১:২৬ সময়

তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন সচিবালয় গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া বহুল আলোচিত রায়টি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। একই সাথে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিল শুনানির জন্য আগামী ১৬ জুন দিন নির্ধারণ করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আপিল প্রক্রিয়া চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের মূল রায়টি স্থগিত থাকবে।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দেন। আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অন্য পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। এর আগে আজ সকালেই তিন মাসের মধ্যে পৃথক স্বাধীন সচিবালয় করার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানি শুরু হয়।
গত ৭ এপ্রিল ১৮৫ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ও পূর্ণাঙ্গ হাইকোর্টের রায়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল। এর আগে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই যুগান্তকারী রায়টি দিয়েছিলেন।
হাইকোর্টের সেই রায়ে অধস্তন বা নিম্ন আদালতে দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের বদলি, কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ শৃঙ্খলা বিধানের সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত থাকা সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বিশেষ বিধানটি বাতিল করা হয়। এর ফলে অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের মূল দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হয়েছিল। একই সাথে অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য ২০১৭ সালে প্রণীত বিতর্কিত শৃঙ্খলাবিধিও সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছিল।
আদালতে রিটকারীদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে মতামত দেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট শরীফ ভূইঁয়া এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ ও ২০১৭ সালের জুডিসিয়াল সার্ভিস বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাতজন আইনজীবী এই রিটটি করেছিলেন। পরে একই বছরের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করেন।
বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচার বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ তথা কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরিসহ শৃঙ্খলা বিধানের চূড়ান্ত ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন।
রিটকারীদের আইনজীবীর মতে, ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মূলত রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সরাসরি হস্তক্ষেপ দেখা যায়, যা বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে খর্ব করে। অথচ ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে অধস্তন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের এই দায়িত্ব সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের ওপরই ন্যস্ত ছিল।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের এই দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এর সাথে ‘সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী আইনটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদের বর্তমান একই বিধানটি আবার প্রতিস্থাপন করা হয়, যা বর্তমানেও সংবিধানে বহাল রয়েছে।