প্রকাশকালঃ ৩০ জুন ২০২৬, দুপুর ৩:০২ সময়

নিজস্ব প্রতিবেদক:
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মামলায় একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া, আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগে উসকানি, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান এবং সহিংস কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় এবং একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। শুনানি শেষে গত বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে গত ২২ জুন মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইনু আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এছাড়া ১৯ জুলাই গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪-দলীয় জোটের বৈঠকে আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে তিনি ভূমিকা রাখেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া, আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে সহায়তা, গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান, বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সম্পৃক্ততা এবং ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত ছিল। একই সঙ্গে দেশব্যাপী সহিংসতায় বহু হতাহত হওয়ার ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থাপন করে।
প্রসিকিউশন আদালতে দাবি করে, ইনু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিতেন। এ দাবির সমর্থনে ফোনালাপের ট্রান্সক্রিপ্ট ও বিশেষজ্ঞ মতামতও আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
অন্যদিকে, বিচার চলাকালে ইনু সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার দাবি করে আদালতে ৬৪ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য জমা দেন এবং অভিযোগগুলোকে কাল্পনিক, বিদ্বেষপ্রসূত ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন। তার আইনজীবীরাও পুনর্তদন্ত, অতিরিক্ত সাক্ষী তলব এবং খালাসের আবেদন করলেও ট্রাইব্যুনাল সেগুলো খারিজ করেন।
২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে তদন্ত কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যসহ মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ২০ সিরিজের নথি ও পাঁচটি আলামত উপস্থাপন করে। অপরদিকে আসামিপক্ষের পক্ষে দুইজন সাফাই সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।
উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি ও যুক্তিতর্ক শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মঙ্গলবার রায় ঘোষণা করে হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে হাসানুল হক ইনুকে আটক করে পুলিশ। পরে বিভিন্ন মামলার পাশাপাশি কুষ্টিয়ায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলাও বিচারাধীন রয়েছে।
১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর জন্মগ্রহণকারী হাসানুল হক ইনু বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০২ সাল থেকে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।