প্রকাশকালঃ ৮ এপ্রিল ২০২৬, দুপুর ৪:১৮ সময়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হলো আজ। দীর্ঘ সময় ধরে চলা রাজনৈতিক বিতর্ক, আইনি লড়াই এবং জনদাবির প্রেক্ষিতে অবশেষে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ‘ করার বিধান রেখে জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে।
আজ বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এই বিল পাসের মাধ্যমে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা বহুল আলোচিত অধ্যাদেশটি এখন স্থায়ী আইনে রূপ নিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে কোনো প্রকার রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারবে না।
মূলত ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনটিতে কোনো বিশেষ ‘সত্তা’ বা রাজনৈতিক দলের সামগ্রিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সরাসরি আইনি সুযোগ ছিল না। পূর্ববর্তী আইনে কেবল ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার বিধান ছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এক বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই আইনি সীমাবদ্ধতা দূর করে।
আজ সংসদে পাস হওয়া বিলটির মূল লক্ষ্য হলো, কোনো রাজনৈতিক সত্তা যদি মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গণহত্যার মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে, তবে রাষ্ট্র যেন তার কর্মকাণ্ড আইনি প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি স্থগিত বা নিষিদ্ধ করতে পারে। বিলটিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আনীত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলাকালীন এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
বিলটি পাসের প্রাক্কালে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধীদলীয় নেতা ‘শফিকুর রহমান‘বিলটি পাসের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তোলেন। তার মূল আপত্তির জায়গা ছিল প্রস্তুতির সময় নিয়ে।
তিনি বলেন, এই স্পর্শকাতর আইনের তুলনামূলক পর্যালোচনার কাগজ (শিট) আমাদের হাতে দেওয়া হয়েছে মাত্র তিন-চার মিনিট আগে। এটি পড়ে বোঝার মতো পর্যাপ্ত সময় আমরা পাইনি। জনগুরুত্বপূর্ণ এই আইনটি পাসের আগে আমাদের আরও কিছুটা সময় দেওয়া উচিত ছিল।
তবে স্পিকার ‘হাফিজ উদ্দিন আহমদ‘ এই আপত্তি নাকচ করে দেন। তিনি জানান, সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী আপত্তি জানানোর নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেছে। বিল পাসের এই অন্তিম পর্যায়ে এসে নতুন করে সময় দেওয়ার আইনি সুযোগ নেই।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এটি কেবল একটি সাধারণ সংশোধন নয়, বরং একটি ‘গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনকে’ আইনি কাঠামোর আওতায় আনার পদক্ষেপ। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার এবং এনসিপি-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত আন্দোলনের ফসল হিসেবেই এই জনমত তৈরি হয়েছে। এই আইনের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশনে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন ইতিপূর্বেই স্থগিত করা হয়েছে।
পাস হওয়া সংশোধনী বিলে কোনো নিষিদ্ধ ঘোষিত সত্তার (এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ) জন্য বেশ কিছু কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
বিলে উল্লিখিত প্রধান নিষেধাজ্ঞাগুলো হলো ‘নিষিদ্ধ সত্তার পক্ষে কোনো প্রকার প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা মুদ্রণ করা যাবে না। ‘কোনো ধরনের অনলাইন মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে দলের হয়ে কোনো প্রচারণা চালানো যাবে না।
‘মিছিল, সভা-সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন বা জনসমক্ষে কোনো ধরনের বক্তৃতা প্রদান করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। ‘দলীয় ব্যানারে কোনো প্রকার সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।
এই বিলটি কেবল স্বতন্ত্র কোনো আইন নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইনের সংশোধিত ৪৭ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। সরকারের লক্ষ্য হলো, ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করা। যদি ট্রাইব্যুনালে দলটি দোষী সাব্যস্ত হয়, তবে এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা স্থায়ী বিলুপ্তিতে রূপ নিতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে স্পষ্ট করেন যে, আগের আইনি কাঠামোতে কোনো রাজনৈতিক দলকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করার পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল না। এই নতুন সংশোধনীর ফলে আইনি পক্ষাঘাত দূর হলো এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এখন আরও শক্তিশালী হবে।
উল্লেখ্য যে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কার্যকালে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ কমিটি এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব পায়।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ‘৯৮টি অধ্যাদেশ’ হুবহু পাস করার সুপারিশ করা হয়। ‘১৫টি অধ্যাদেশ’ সংশোধিত আকারে গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ‘বাকিগুলোর মধ্যে কয়েকটি রহিত এবং কয়েকটি আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ রয়েছে।
আজ পাস হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’টি সেই ১৫টি অধ্যাদেশের একটি, যা সংসদীয় কমিটি কিছুটা পরিবর্তনের সুপারিশ করলেও শেষ পর্যন্ত অধ্যাদেশের মূল বিষয়বস্তু অপরিবর্তিত রেখেই পাস করা হয়েছে।
এই বিল পাসের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সরকারের সমর্থক ও জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সাথে জড়িত ছাত্র-জনতা একে ‘ন্যায়বিচারের পথে বড় ধাপ’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের রাজনৈতিক অধিকার থাকার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই।
অন্যদিকে, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার এই আইনি পদক্ষেপ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দেবে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন স্থগিত হওয়া এবং এখন আইনিভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি ঝুলে রইল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের ওপর।
আজকের এই সিদ্ধান্ত কেবল আইনি নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র এই বার্তাই দিল যে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব সুরক্ষিত নয়। তবে এই আইনের প্রয়োগ কতটা নিরপেক্ষ থাকে এবং বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীনভাবে এর চূড়ান্ত মীমাংসা করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায়ের জন্য, যা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনীতির আগামী দিনের গতিপথ।