প্রকাশকালঃ ৮ এপ্রিল ২০২৬, দুপুর ৩:০২ সময়

আকাশে বারুদের গন্ধ আর সমুদ্রের বুকে ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগর হয়ে উঠেছিল বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক এলাকা। আর এই অশান্ত সাগরের বুকেই আটকা পড়েছিলেন ৩১ জন বাংলাদেশি লড়াকু সন্তান।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া ভয়াবহ সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালির ভেতরে পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’।
তবে বুধবার ভোরে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর অন্ধকার কেটে আলোর দিশা পেয়েছে জাহাজটি। দীর্ঘ বন্দিদশা শেষে পুনরায় নোঙর তুলে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশের এই জলযান।
বুধবার ভোরে যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির খবর ছড়িয়ে পড়ে, তখন পারস্য উপসাগরের বহির্নোঙরে থাকা এমভি বাংলার জয়যাত্রার নাবিকদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর ১২টায় জাহাজটি সৌদি আরবের দাম্মাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে যাত্রা শুরু করেছে। এসময় জাহাজটির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৮ দশমিক ৩০ নটিক্যাল মাইল। ১০ দশমিক ৮০ মিটার ড্রাফটের এই বিশালাকার জাহাজটি এখন ধীরলয়ে অগ্রসর হচ্ছে হরমুজ প্রণালির দিকে।
জাহাজটির প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান সমুদ্রের বুক থেকে এক বার্তায় বর্তমান পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, জাহাজটি সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করেছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে তারা দাম্মাম বন্দরের বহির্নোঙরে নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন।
যুদ্ধবিরতির সংকেত পাওয়ার পরপরই তারা নোঙর তুলেছেন। বর্তমানে তারা হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ৪২৫ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী দুই দিনের (প্রায় ৪০ ঘণ্টা) মধ্যে তারা এই বিপজ্জনক প্রণালিটি পার হয়ে ভারত মহাসাগরের উন্মুক্ত নীল জলরাশিতে প্রবেশ করতে পারবেন।
এমভি বাংলার জয়যাত্রার এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। জাহাজটির লগবুক ও বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, গত ২ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে পণ্য নিয়ে জাহাজটি প্রথম হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছিল। সে সময় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক ছিল।
এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায় জাহাজটি।
ঠিক তার পরদিনই মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য বদলে যায়। ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান পুরো অঞ্চল জুড়ে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ শুরু করলে সংঘাত ভয়াবহ রূপ নেয়। গত ১১ মার্চ জেবেল আলী বন্দরে পণ্য খালাস শেষ করার পর জাহাজটির কুয়েতের বন্দরে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। ৩১ জন নাবিকের জীবন বাঁচাতে জাহাজটিকে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণ জাহাজ চলাচল এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে।
নিরাপত্তার কারণে জাহাজটি পুনরায় আগের অবস্থানে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ প্রায় এক মাস তারা এক প্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় পারস্য উপসাগরের ভেতরে দিন কাটিয়েছেন।
বিপজ্জনক যুদ্ধকবলিত এলাকায় বাংলাদেশি জাহাজ আটকে পড়ার খবরটি বিএসসি এবং সরকারের শীর্ষ মহলে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছিল। জাহাজে থাকা ৩১ জন নাবিকের পরিবারও ছিল চরম দুশ্চিন্তায়। তবে জাহাজটির প্রধান প্রকৌশলী এবং ক্যাপ্টেন নিয়মিতভাবে বিএসসি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। নাবিকদের খাবার ও পানীয় জলের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করা হয়েছিল।
বিএসসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নাবিকদের জীবন সুরক্ষাকেই তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এখন জাহাজটির গন্তব্য ঠিক করা হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বন্দর। সেখানে পৌঁছানোর পর নাবিকরা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে স্বস্তির বিশ্রাম নিতে পারবেন।
হরমুজ প্রণালি হচ্ছে বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান ধমনী। বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধের কারণে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ৯৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল, যা বিশ্ববাজারে তেলের দামকে আকাশচুম্বী করে তোলে।
এমভি বাংলার জয়যাত্রা এখন সেই প্রণালিটিই অতিক্রম করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পথটি এখনো শতভাগ নিরাপদ নয়। যদিও যুদ্ধবিরতি চলছে, তবুও ইরানি বাহিনীর উচ্চ সতর্কতা এবং সাগরে মাইন থাকার আশঙ্কায় অত্যন্ত সাবধানে জাহাজ চালাতে হচ্ছে বাংলাদেশি ক্যাপ্টেনকে।
বাংলাদেশে থাকা নাবিকদের পরিবারগুলো এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাদের প্রিয়জনদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য। জাহাজটি যখনই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশ করবে, তখনই তাদের বড় একটি ঝুঁকি কাটবে। চট্টগ্রামের বিএসসি কার্যালয়েও এখন স্বস্তির আমেজ। কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত মেরিন ট্রাফিকের মাধ্যমে জাহাজের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছেন।
এমভি বাংলার জয়যাত্রার এই যাত্রা কেবল একটি ব্যবসায়িক জাহাজ চলাচল নয়, বরং এটি যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝে একটি উন্নয়নশীল দেশের সাহসিকতার প্রতীক। পারস্য উপসাগরের আগুনের গোলার মধ্য থেকে ৩১ জন নাবিককে নিয়ে জাহাজটি যখন সফলভাবে ফিরে আসবে, তখন সেটি হবে বাংলাদেশের সমুদ্র বাণিজ্যের এক বড় স্বস্তি।
এখন কেবল দুই দিনের অপেক্ষা হরমুজের শান্ত জলরাশি পার হয়ে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ আবার বিশ্বজয়ের পথে এগিয়ে যাবে, এটাই এখন সারা বাংলাদেশের প্রত্যাশা।