প্রকাশকালঃ ৩১ মার্চ ২০২৬, দুপুর ৪:৩১ সময়

পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ যখন ঘরে ঘরে উদযাপিত হওয়ার কথা, তখন শত শত পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথ যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। গত ১৫ দিনের ঈদযাত্রায় সারা দেশে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৯৪ জন, আর পঙ্গুত্ব বরণ বা আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৮৮ জন। এর মধ্যে সিংহভাগ মৃত্যুই ঘটেছে সড়কে।
সোমবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে এই তথ্য সংগ্রহ করেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী:
মোট দুর্ঘটনা: ৩৭৭টি (সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে)।
সড়ক দুর্ঘটনা: ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত ও ১ হাজার ৪৬ জন আহত।
রেলপথ: ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও ২২৩ জন আহত।
নৌপথ: ৮টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত, ১৯ জন আহত ও ৩ জন নিখোঁজ।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২৫ সালের তুলনায় এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা ৮.৯৫ শতাংশ এবং প্রাণহানি ৮.২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি আহত হওয়ার হার বেড়েছে ২১ শতাংশ। বিশেষ করে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে এই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২ হাজার ১৭৮ জন রোগী ভর্তি হওয়া সড়কের নাজুক পরিস্থিতিরই প্রমাণ দেয়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বরাবরের মতোই দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬.১২ শতাংশ এবং নিহতের ৩৮.৪৬ শতাংশই মোটরসাইকেল কেন্দ্রিক। ১২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৫ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণ প্রজন্মের কাছে মোটরসাইকেল এখন এক ‘মরণ ফাঁদ’।আবেগের বশবর্তী হয়ে অল্প বয়সী সন্তানদের হাতে অভিভাবকরা বাইক তুলে দিচ্ছেন, যা পরবর্তীতে সারাজীবনের কান্নায় পরিণত হচ্ছে। অনেক বাবা-মা আক্ষেপ করে বলছেন, ‘সন্তানের আবদার মেটাতে গিয়ে যে মৃত্যু কিনছি, তা জানতাম না।’
সংবাদ সম্মেলনে এবং জনমানুষের বক্তব্যে সড়ক দুর্ঘটনার বেশ কিছু মৌলিক কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো:
১. অদক্ষ ও মাদকসেবী চালক: মালিকপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে সঠিক যাচাই-বাছাই না করেই চালক নিয়োগ দেন। অনেক চালক মাদকাসক্ত হওয়ায় তারা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান।
২. অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা: ঈদের সময় বাড়তি আয়ের নেশায় মালিকরা একজন চালক দিয়েই একটানা ৪-৫ দিন গাড়ি চালানোয়। ঘুমের অভাব ও শারীরিক ক্লান্তির কারণে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। বিশেষ করে ট্রাক ও পিকআপ চালকদের টানা ৮ দিন পর্যন্ত গাড়িতে থাকতে হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
৩. বিপজ্জনক যানবহন: মহাসড়কে থ্রি-হুইলার, ইঞ্জিনচালিত অটোরিকশাসহ প্রায় ১০ ধরনের ধীরগতির যানবাহন চলাচল করছে। এদের বাঁচাতে গিয়ে অনেক সময় বড় বাস বা ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বড় ধরনের প্রাণহানির শিকার হয়।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব অভিযোগ করেন, সড়ক ব্যবস্থাপনা সভায় যাত্রী স্বার্থ বা নাগরিক সমাজের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয় না। বরং মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের চাপে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো অনেক সময় জনস্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং প্রভাবশালী মালিক নেতাদের আধিপত্যের কারণে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না।
গাফিলতির এই চক্র শুরু হয় মালিক থেকে, এরপর মালিক সমিতি, হাইওয়ে পুলিশ এবং সবশেষে সরকারের তদারককারী সংস্থাগুলোর ওপর এর দায় বর্তায়।
সাধারণ জনগণ এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ দিয়ে সড়কের এই ‘মৃত্যুর মিছিল‘থামানো সম্ভব নয়Cসড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:চালকের স্বাস্থ্য ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা: কোনো চালককে দিয়ে টানা ৮ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো যাবে না। মালিকদের বাধ্য করতে হবে যাতে তারা বিকল্প চালক রাখেন।
হাইওয়ে থেকে অটোরিকশা ও নসিমন-করিমন পুরোপুরি অপসারণ করতে হবে। হাইওয়ে পুলিশের টহল জোরদার করতে হবে এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে আপসহীন ব্যবস্থা নিতে হবে।
মালিকদের দায়বদ্ধতা: দুর্ঘটনায় চালকের পাশাপাশি মালিককেও আইনের আওতায় আনতে হবে যাতে তারা অদক্ষ চালক নিয়োগ থেকে বিরত থাকেন।