প্রকাশকালঃ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকাল ৭:১৫ সময়

মোঃ সুরুজ আলী, নাটোর প্রতিনিধি:
একসময় পাটখড়ি ছিল মূলত গ্রামের মাটির চুলার জ্বালানি। পাটের আঁশ সংগ্রহের পর এর তেমন কোনো অর্থনৈতিক মূল্য ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র। বর্তমানে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় পাটখড়ির ব্যবহার ও চাহিদা বাড়ায় এটি কৃষকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাটের আঁশের চেয়েও পাটখড়ি বিক্রি করে বেশি অর্থ পাচ্ছেন কৃষকরা।
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে পাটখড়ির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে পাট চাষেও কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। পাটখড়ি এখন শুধু জ্বালানি হিসেবেই নয়, বাড়ির বেড়া, গোয়ালঘর ও বিভিন্ন ধরনের অস্থায়ী ঘের তৈরিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে। সবজি ও অন্যান্য ফসলের জমি পশুর হাত থেকে রক্ষা করতেও পাটখড়ি দিয়ে অস্থায়ী বেড়া তৈরি করেন কৃষকরা।
উপজেলার দ্বারীখৈর গ্রামের পাটচাষি মোতালেব হোসেন বলেন, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২০ মণ পাটখড়ি উৎপাদন হয়। প্রতি মণ পাটখড়ি গড়ে এক হাজার টাকা দরে বিক্রি করা যায়। পাটের আঁশ বিক্রি করে উৎপাদন খরচ বাদ দেওয়ার পর লাভ খুব বেশি না থাকলেও পাটখড়ি বিক্রি করে বাড়তি আয় করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগে পাটখড়ি অন্যান্য জ্বালানির সহযোগী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখন এর ব্যবহার অনেক বেড়েছে। বাড়ির বেড়া, গোয়ালঘরসহ বিভিন্ন কাজে পাটখড়ি ব্যবহারের পাশাপাশি কৃষিজমি সুরক্ষায়ও এটি কাজে লাগানো হচ্ছে।
হারোয়া গ্রামের কৃষক সাব্দুল আলী বলেন, পাটখড়ি শুকিয়ে সংরক্ষণ করা সহজ। মাঠ থেকে সংগ্রহের পর রাস্তার পাশে, মাঠে কিংবা বাড়ির উঠানে রোদে শুকিয়ে ছোট ছোট আঁটি করে সংরক্ষণ করা হয়। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষক এখন পাটখড়ি শুকানো ও সংরক্ষণে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পাটখড়ির চাহিদা এখন আর শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ নেই। ব্যবসায়ীরা গ্রাম থেকে পাটখড়ি সংগ্রহ করে শহর ও বিভিন্ন বাজারে নিয়ে বিক্রি করছেন। এমনকি ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরের মিল-কারখানায়ও পাটখড়ি সরবরাহ করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ী আলতাব হোসেন বলেন, মানভেদে এক বিঘা জমির পাটখড়ি কৃষকের কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় কেনা হয়। পরে সেগুলো ছোট ছোট আঁটি করে গ্রাম ও শহরে ফেরি করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়। বিভিন্ন শহরের মিল-কারখানায় সরবরাহ করলে আরও বেশি দামে বিক্রি হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সজিব আল মারুফ জানান, চলতি মৌসুমে বড়াইগ্রামে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার ২২০ হেক্টর। এর বিপরীতে ১০ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে, যা প্রায় ৮১ হাজার ২৩৬ বিঘার সমান। জমির ধরনভেদে প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২০ মণ পর্যন্ত পাটখড়ি উৎপাদন হয়ে থাকে।
বাউয়েটের কেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক এবং ডাইরেক্টর অব রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন সেলের দায়িত্বে থাকা ড. ছাইফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে পার্টিকেল বোর্ড ও ফাইবারবোর্ড, কাগজ, প্রিন্টার মেশিনের কালি, হস্তশিল্পসহ পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে সীমিত পরিমাণে পাটখড়ি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। দেশে সংশ্লিষ্ট মিল-কারখানা গড়ে উঠলে পাটখড়ি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় পাটখড়ির ব্যবহার বাড়লে এর বাজারও সম্প্রসারিত হবে। এতে কৃষক পাটের পাশাপাশি পাটখড়ি থেকেও বাড়তি আয় করতে পারবেন এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।