প্রকাশকালঃ ১৪ মার্চ ২০২৬, দুপুর ১২:১৮ সময়

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির (ইআরএল) মজুতে। বর্তমানে চট্টগ্রামের এই শোধনাগারে প্রায় এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল (ক্রুড) মজুত রয়েছে, যা দিয়ে সর্বোচ্চ আরও ২০ থেকে ২২ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর মধ্যে নতুন চালান না এলে শোধনাগারের উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ৬০০ কোটি টাকা মূল্যের এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী একটি ট্যাঙ্কার গত সাত দিন ধরে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকা পড়ে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় জাহাজটি এখনও বাংলাদেশগামী যাত্রা শুরু করতে পারেনি।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, নরডিক পোলাক্স নামের ওই ট্যাঙ্কারে গত ৩ মার্চ অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড তেল বোঝাই করা হয়। পরে যাত্রা শুরু করলেও পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় জাহাজটি আবার বন্দরের বহির্নোঙরে ফিরে যায় এবং বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছে।
চলতি মাসে আরও একটি ট্যাঙ্কারে করে অপরিশোধিত তেল দেশে আনার পরিকল্পনা ছিল। ‘ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের ওই জাহাজটির আগামী ২০ থেকে ২১ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল ধানা বন্দর থেকে আরও এক লাখ টন তেল নেওয়ার কথা ছিল। বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে জাহাজটির মালিকপক্ষ সেখানে জাহাজ পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করেছে। জাহাজ ভাড়া দেওয়া সংস্থা ইতোমধ্যে প্রায় ১০ দিনের বিলম্বের অনুরোধ করেছে।
এ পরিস্থিতিতে কর্মকর্তারা বিকল্প হিসেবে হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত ফুজাইরাহ বন্দর থেকে তেল সংগ্রহের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন। তবে সেখানে জাহাজের বার্থ পাওয়া, সরবরাহ ব্যবস্থা ও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
রিফাইনারি সূত্র জানায়, শোধনাগারটির মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার টন। বর্তমানে সেখানে প্রায় এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। দৈনিক প্রায় সাড়ে চার হাজার টন অপরিশোধিত তেল শোধন করা সম্ভব হওয়ায় বর্তমান মজুত দিয়ে আরও প্রায় তিন সপ্তাহ উৎপাদন চালানো যাবে।
এই মজুত থেকে প্রায় ৪০ হাজার টন ডিজেল, ১৫ থেকে ২০ হাজার টন পেট্রোল ও অকটেন এবং প্রায় ৩০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল উৎপাদন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা
জ্বালানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির প্রায় ৯২ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশীয় উৎস থেকে আসে মাত্র ৮ শতাংশ। এই দেশীয় জ্বালানির বড় অংশই আসে গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে, পাওয়া যায় পেট্রোল ও অকটেন।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। মোট চাহিদার মধ্যে মাত্র ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে শোধন করা হয়। দেশে দ্বিতীয় তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা অনেক বছর ধরে আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়ন ধীরগতির কারণে দেশীয় পরিশোধন সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। এরপর ইরানের পাল্টা হামলায় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেলের বড় অংশ এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই রুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের বড় অংশই এই প্রণালি ব্যবহার করে দেশে আসে।
বিপিসি সূত্র জানায়, প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড তেল সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আরামকো থেকে এই পথে আমদানি করা হয়।